মধ্যবিত্তের সংকট উত্তরণে তীব্র আশাবাদ

আজাদ এহতেশাম

ত্রিশোত্তর বাংলা কাব্যের উত্তরণ পরিক্রমায় আধুনিক কাব্য মনস্কতায় চিন্তাশৈলী ও ভাব ভাষায় স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের অধিকারী কবি আহসান হাবীব (১৯১৭-১৯৮৫) সমকালীন সাহিত্যবোদ্ধাগণের দৃষ্টি আকর্ষণে সমর্থ হয়েছিলেন। দুই বিশ্বযুদ্ধের অন্তর্বর্তীকালে যুদ্ধের ভয়াবহ অভিঘাতে সমাজ ও রাষ্ট্রে ব্যাপক পরিবর্তন সূচিত হয়। পরিবর্তন আসে কবিদের চিন্তা-চেতনা উপলব্ধি অভিজ্ঞতা ও অভিজ্ঞানের প্রবাহমানতার দিক নির্দেশনাতে। কেবলমাত্র ত্রিশোত্তর কাব্যধারার একজন বিশিষ্ট কবি আহসান হাবীব নন; সমকালীন কাব্য ধারায় আত্মস্থ ও লীন হয়ে মধ্যবিত্তের গভীর জীবনবোধ ও সত্তার সংকটময় পরিস্থিতি তাঁর কাব্যভূমে প্রকটিত হয়েছে যা তাঁকে স্বতন্ত্র কবির মর্যাদায় অভিষিক্ত করেছে।
ahsan habib
টি.এস. এলিয়ট (১৮৬৫-১৯৩৯) এর ‘ওয়েস্ট ল্যান্ড (১৯২২)’ এবং ফরাসি কবি শার্ল বোদলেয়ারের  (১৮২১-১৮৬৭) ‘প্যারিশ স্প্যালেন (১৮৬৯)’, ‘দি ফ্লাওয়ার অব ইভিল (১৮৫৭)’ রিভিউ অব টু ওয়ার্ডস (১৮৫৫) এবং ‘মিরর অব আর্ট (১৮৫৫)’, কাব্য প্রকাশের মধ্যদিয়ে বাংলা কাব্যাঙ্গনে যে আধুনিকতার সূত্রপাত সূচিত হয়েছিল ত্রিশের কবিরা সে ভাবধারায় কাব্য রচনায় ব্যাপকভাবে উৎসাহী হয়ে ওঠে। কবিতার বিষয় ও প্রকরণে চিন্তা চেতনার অনুধ্যানে আধুনিক বাংলা কবিতা বাঁক বদলে নতুনত্বের পথে অগ্রসর হতে থাকে। কবি আহসান হাবীব প্রবর্তিত নতুন ধারার অন্যতম একজন আধুনিক কবি। ড. হুমায়ুন আজাদ এ প্রসঙ্গে লিখেছেন, ‘তিনি প্রথম প্রকৃত আধুনিক কবি।… আহসান হাবীবের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘রাত্রিশেষ’ রেরোয় ১৯৪৭-এ এবং এ কাব্যেই সর্বপ্রথম একজন মুসলমান কবি ব্যাপক বিশ-শতকী চেতনাসহ আত্মপ্রকাশ করেন।’ ১
আসহান হাবীবের কাব্যের বিষয়বস্তু বহু বর্ণিল বৈচিত্র্যতা পরিলক্ষিত হলেও একটি বড় অংশ বিস্তৃত মধ্যবিত্ত শ্রেণির নানা সংকট ও টানাপোড়নের অনুপুঙ্খ বিশ্লেষণের চালচিত্র। তাঁর সংবেদনশীল কবি চিত্তের সংশ্লিষ্টায় সমকালীন যুগযন্ত্রণা, সামাজিক অস্থিরতা, মধ্যবিত্তের জীবন সংগ্রাম, প্রাপ্তি ও প্রত্যাশা, শ্রেণিবৈষম্য ও রাজনৈতিক অস্থিরতা, পুঁজিবাদী শাসন ব্যবস্থায় মানুষে মানুষে অসাম্য ও অসঙ্গতি তাঁর নিখুঁত তুলির আঁচড়ে মূর্ত হয়ে উঠেছে। কখনো কখনো তাঁর কাব্যে তীর্যক ব্যাঙ্গাত্মক বাক্যাবরণে সমাজের অন্যায় ও অসঙ্গতির চিত্র প্রতিভাত হয়েছে। তাঁর কবিতার ভাষা শৈলী শান্ত সমাহিত নিটোল মুগ্ধ কোমল ও অন্তরজাত নীরব রুদ্রতাহীন মায়াময় এক সুস্থিতি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বৈশ্বিক পরিবর্তনে এ দেশে উপনিবেশিক শাসন শোষণে মধ্যবিত্তের জীবনে নানা টানাপোড়েন ও সংকট প্রকট আকার ধারণ করে। এই শ্রেণির মানুষের জীবন সংগ্রাম, স্বপ্ন ও সম্ভাবনাময় জীবনের তীব্র আশাবাদের প্রতিচ্ছবি তাঁর কাব্যে মূর্ত হয়ে উঠেছে সহানুভূতিশীল চিত্তের প্রাখর্যে। মানুষের জীবন নিয়ত সংগ্রামশীল। প্রাপ্তির আশা ও প্রত্যাশাই গন্তব্যে পৌঁছানোর অনুঘটক। আশাই জীবন, জীবনের শ্রী, বেঁচে থাকার প্রেরণা ও কর্মোদ্দীপণার মূলমন্ত্র। মূলত আহসান হাবীবের কাব্যে মধ্যবিত্তের জীবন ও সংকটে নতুনের স্বপ্ন ও সম্ভাবনা এবং তীব্র আশাদের যে প্রতিফলন প্রত্যক্ষীভূত হয়েছে সে দিকটাই বক্ষ্যমাণ প্রবন্ধে দিকপাত হয়েছে।
জীবনের অশেষ স্বপ্ন ও সম্ভাবনা কখনোই পূর্ণতা পায় না; অপূর্ণতার ক্লান্তিবোধে ক্ষণিক বিরতি হলেও আবারও মানুষ নতুন স্বপ্নে বিভোর হয়ে ওঠে। এভাবেই প্রাপ্তি ও প্রত্যাশার দ্বৈরথে অস্থির মানবচিত্ত অনন্তকালাবধি কেবল অতৃপ্তই থেকে যায়। সম্ভাবনাময় স্বপ্নের প্রাপ্তিতে অস্থির মানব মন আবার উদগ্রিব হয়ে ওঠে। আশা কখনো কখনো দুঃসহ বেদনা, দীর্ঘ প্রতীক্ষার অক্লান্ত যন্ত্রণাময় অনুভূতির দীর্ঘশ্বাস। কবির একান্ত উপলব্ধিতে তাই ব্যক্ত হয়েছে:
অশেষ আশার দিন পলাতক, আজো মিলায়নি ছায়া,
আজো দিগন্তে স্বপ্নের মতো তারি অপরূপ কায়া
স্মরণের তীরে তীর্যক হয়ে ক্লান্ত নয়নে কাঁপে
আজো এ হৃদয় দিনের আশাতে দুঃসহ দিন যাপে।
[“এই মন- এ মৃত্তিকা’ ‘রাত্রিশেষ’]
সময়ের পরিবর্তনে ভেঙ্গে পড়ে মানুষের বেঁচে থাকার স্বপ্ন ও সম্ভাবনাময় কাক্সিক্ষত ভবিষ্যৎ। নীতি নৈতিকতার বিসর্জনে মানবিক মূল্যবোধহীন বিশ্বাসঘাতক শ্রেণির আবির্ভাব ঘটে সমাজের সর্বস্তরে। অর্থ বিত্ত ও রাষ্ট্রক্ষমতার দৌড়াত্মে প্রতারক শোষক শ্রেণি গোটা সমাজ ব্যবস্থাকে সংকটাপন্ন করে তোলে। তাদের অন্যায় ও অবিচারে অসহায় নিরীহ মানুষের আর্তনাদে আকাশ ভারী হয়ে ওঠে। সেখানে মানুষে মানুষে সম্প্রীতি, প্রেম-ভালোবাসা নেই, বেঁচে থাকার আশা ও আশ্বাস নেই, কেবল আছে নিরীহ দুর্বল কল্যাণকামী আত্মত্যাগী নীতিবান মানুষের পদে পদে লাঞ্ছিত হওয়ার শঙ্কা ও সম্ভাবনা। মানুষের এ নৈতিক স্খলনে মানুষ বর্তমানে ইতর প্রাণির পর্যায়ভুক্ত উপলব্ধি করে কবির কাব্য পঙক্তিতে হতাশার চিত্র ফুটে উঠেছে :
প্রত্যয়ের দিন নাই, প্রতিশ্রুতি বিদ্রুপ-বিক্ষত
আশা ও আশ্বাস নাই, প্রেম হেথা স্বভাব বণিক;
নির্মাংশ অস্থির পাশে ভিড় করি কুকুরের মত,
দীর্ঘদিন বাঁচি মোরা জীবনের নিত্য দিয়া ধিক!
[“দ্বীপান্তর” ‘রাত্রিশেষ’]
প্রকট সামাজিক অবক্ষয়ে দিকভ্রান্ত মানুষ কয়েদীর মতো বন্দী এ পৃথিবীর নির্মম কারাগারে। মানুষ হতাশা ও ব্যর্থতায় জীবনের প্রতি বীতঃশ্রদ্ধ হয়ে পিঞ্জরাবদ্ধ পাখির মতো ডানা ঝাপটাতে থাকে। মুক্তির আশা সুদূর পরাহত, স্বাধীনতা যেন অপূর্ণ স্বপ্নের হাতছানির মতো মায়াময় মরীচিকা। বাঙালির অমিত শক্তি ও সাহসের অতীত ঐতিহ্য আছে- তারা সকল অন্যায় অসঙ্গতি ও পঙ্কিলতা মুক্ত করে নতুন দিনের সূর্য জাতির সামনে উদ্ভাসিত করতে সমর্থ হবেই হবে। জাতির ভাগ্য ললাটের কলঙ্কময় অমানিশা ভেদ করে একদিন না একদিন রঙিন স্বপ্নময় নতুন সূর্য পূর্ব দিগন্তে উদয় হবে। কবির সে বিশ্বাস ও প্রতীক্ষার চিত্র ফুটে উঠেছে:
আছে শুধু হাতের মশাল
আছে এই নগ্ন শির বিবর্ণ উলঙ্গ এই ভাল!
আমাদের রক্তে আছে পাদপিষ্ট রক্তের ছোঁয়াচ!
আমাদের অস্থিঘিরে আছে এক নতুনের ছাঁচ।
আছে সেই অনাগত দিন
হাতে আছে সেই সূর্য-পরিক্রমা স্বপ্ন রঙিন।
[“কয়েদী” ‘রাত্রিশেষ’]
কবিচিত্তের অনুধ্যানে কেবলই পরিদৃষ্ট হয় শান্তি সহযোগে মুখরিত কল্যাণময় এক স্বর্গীয় পৃথিবীর। কিন্তু সে প্রত্যাশার অপূর্ণতায় কবি কখনো হতাশায় উচ্চকিত নন। Margaret Mitchell এর ভাষায় ‘Life’s under no obligation to give us what we expect.’  অসীম ধৈর্য ও সাহসিকতায় কবি সকল বাধা বিঘ্ন অতিক্রম করে একটি সুস্থ ও পরিচ্ছন্ন সমাজ বিনির্মাণে তাঁর চেষ্টা অব্যাহত রাখবেন। কবির বিশ্বাস রাতের অন্ধকার যতই গাঢ় হোক একদিন না একদিন তা ভেদ করে নতুন সূর্য পূর্ব আকাশে উদিত হবে। কবির গভীর আশ্বাস ফুটে উঠেছে :
রাত্রির আকাশ ঘিরে জেগে থাকে চাঁদ;
আশা জাগে ভাষা পাই মনে পাই গভীর আশ্বাস।
লিখি ইতিহাস
আগামী দিনের এক পৃথিবীর প্রাচুর্যের গান।
অনাগত মানুষের প্রাণ
পৃথিবীর পথে পথে দিয়ে যাই সহজে জাগিয়া
মনের মাধুর্য আর হাতের সবল মুঠি দিয়ে।
[“জীবন” ‘ছায়াহরিণ’]
পরিবেশ ও পারিপার্শ¦ বিবেচনায় কবি অবক্ষয়িত সমাজের সহিষ্ণু সন্তান। নিত্য সংগঠিত মানবতার বিপর্যয়ে ও অপমানে তাঁর ব্যথিত কবিচিত্ত কখনো হতাশ হয়নি। সকল বিপর্যয় ও অসঙ্গতির দূরীভূত হয়ে আগামীতে এ পৃথিবী পঙ্কিলতা মুক্ত হবে। শান্তি স্বস্থির স্পর্শে এ পৃথিবী আবার নতুন সূর্যের আলোয় ঝলমল করে উঠবে। কবি এই দিনের প্রতীক্ষায় গভীর আগ্রহে উন্মুখ হয়ে আছেন। কবির কাক্সিক্ষত সে দিনের আগমনে স্বীয় জীবনাবসনেও ধন্য মনে করবেন এমনটিই তাঁর অন্তস্তলের কামনা:
আশৈশব পিপাসার প্রতিমায় এই অবক্ষয়,
এই নিত্য শেষ হওয়া মুছে যাওয়া এই অপমান
একদা সার্থক হবে পৃথিবীতে।
আসন্ন আগামীকাল
জন্ম দেবে সে অমর্ত্য অটল মহৎ প্রতিভার
আর
নতুন সূর্যের তাপে উষ্ণ হবে পৃথিবীর বুক
এবং আমার
মৃত্যুও মহৎ হবে।
[“শুক্লপক্ষেয় গান” ‘ছায়া হরিণ’]
জীবন সব সময়ই সংগ্রামশীল; সংগ্রামের বন্ধুর পথ অতিক্রমেই সাফল্য এসে ধরা দেয় জীবনে। সংগ্রামবিহীন জীবন স্রোতহীন নদীর মতই নিরানন্দময় ও বৈচিত্র্যহীনতার স্থবির। পরিশ্রম ও সংগ্রামের মধ্যদিয়ে জীবনের সঞ্চয় সংগ্রহ করতে হবে। জীবন বৃথা নয় জীবনকে ভালোবেসে পৃথিবীকে গড়তে হবে সুস্থ সুন্দর জীবনের প্রত্যয়ে। Albent Einestein Gi fvlvq ‘The man who regards life as meaningless is not merely unfortunates but almost disqualified for life’ কবিও জীবনকে ভালোবেসে পৃথিবীর অরণ্যের ছায়ার আশ্রয়ে নীড় বেঁধে স্বস্তির নিঃশ্বাস নিয়ে বেঁচে থাকার আগ্রহ ব্যক্ত করেছেন :
এতদিনে মনে হলো এখানেই বাঁধতে হবে নীড়,
মাটি থেকে তুলতে হবে অশেষ সঞ্চয়
অনায়াস জীবনের; পৃথিবীকে ভালোবাসতে হবে
অনেক গভীর করে, সুন্দর সহজ করে
গড়ে নিতে হবে জীবনকে।
[“পুনর্বাসন” ‘ছায়াহরিণ’]
জন্মভূমির প্রতি কবির প্রগাঢ় ভালোবাসা তাঁর অজস্র কাব্য পঙক্তিতে উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছে। জন্মভূমি কবির আশা ও বিশ্বাসের আশ্রয়স্থল। তাইতো কবি হৃদয়ে লালন করেন গভীর ভক্তি ও ভালোবাসায় দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সৌন্দর্যের অতুলৈশ্বর্যতা। জন্মভূমি ছাড়া আত্মার অস্তিত্ব বিপণœ ও অকল্পনীয়। তাই কবির কাছে জন্মভূমি আত্মার চেয়েও অধিক গুরুত্ববহ।
‘তোমাতেই আশা রাখি আমার অবিনশ্বর জন্মভূমির
অমর্থিত অটল রূপের
আর অবিনশ্বর ঐতিহ্যের।
আমার অমর আত্মা তোমাতেই বাঁচে
তাই তুমি বড়ো আমার আত্মার চেয়েও।
[“আশা রাখি কেননা” ‘সারা দুপুর’]
মুক্ত দিনের নতুন আলোয় এ দেশ হবে একদিন শান্তি সুখের শান্ত নিবাস। ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ ঝড়ের অবসানে সুনির্মল আকাশে উদিত হবে নতুন সূর্য। মাঠে মাঠে ফলবে ফসল, ফুলে ফলে শোভিত হবে দেশমাতৃকার অপরিমের স্নিগ্ধতার ঐশ্বর্য। মানুষের চোখে মুখে ফুটে উঠবে বেঁচে থাকার নতুন আশা ও সম্ভাবনা। কবি প্রিয়জনের জন্যে নতুন দিনের আলোয় শান্তিময় পৃথিবী গড়ে তুলে নতুন জীবনের আশ্বাস দিতে চেয়েছেন অকৃত্রিম ভালোবাসার হৃদবন্ধনে।
দেখে যাবো তোমার শীর্ণ চোখের কোলে
আলোর বন্যা
নতুন দিনের আলোয় নেয়ে
শীর্ণ দেহ জাগবে আবার
নতুন জীবন
নতুন প্রেমে,
এই আশাতে-।
[“তোমার জন্য” ‘সারা দুপুর’]
আশাই জীবন, আশাহীন জীবন মৃত্যুর শামিল। তাই যতক্ষণ মানুষের জীবন থাকে ততক্ষণ আশাও থাকে। আশাই কর্মের প্রেরণা জীবন সংগ্রামে বিজয়ের অনুপ্রেরণা। সংসারের অবিরত ঘাত প্রতিঘাতে ক্লান্ত মানুষ আশাতেই বেঁচে থাকে। আশার কখনো নিবৃত্তি ঘটে না অনন্তকালাবধি তার নিরন্তর প্রবাহমানতা। Emily Dickinson Gi fvlvq :
‘Hope is the thing with feathers
That perches in the soul
And sings the tune without the words
And never stops at all.’
শত বাধা বিপত্তি চড়াই-উতরাইয়ে কোন কিছু পাওয়ার আকাক্সক্ষা থেকে মানুষ কখনো বিরত হয় না। নতুন আলোর শিখায় একদিন না একদিন সে পৌঁছে যায় প্রত্যাশিত গন্তব্যের প্রান্তসীমায়। আহসান হাবীবের কবিতায় সে চিত্রই ফুটে ওঠে :
বিজন নদীর ঘাটে অন্ধকার!
আলোর পথে বিছায় কাঁটা কোন দুরাচার!
তবু আশার আলোর শিক্ষা নেভে না কার।
তার দু’চোখের আশার আলো উঠোন ভাঙ্গে,
আলোর পথে যায় এগিয়ে ঘাটের গাঙে
ঘাটের পথে রোজ সে আলো উঠোন ভাঙে!
[“কাহিনী নিরন্তর” ‘আশায় বসতি’]
আহসান হাবীব অনুভূতির তীর্যকতায় অনুভব করেছেন দেশের পরিবেশ পরিস্থিতি। ধনী-নির্ধন সবাইকে হৃদয়ের বন্ধনে একত্রে করে এ দেশটিকে আবার নতুন করে গড়ে তোলার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। সবার সহযোগিতা ও আন্তরিকতায় তিনি নতুন নতুন শহর ও গ্রাম বানাতে আগ্রহী। সেখানে মানুষে মানুষে থাকবে না কোন বিভেদ ও বিভক্তি; থাকবে অনাবিল সৌহার্দ্য সম্প্রীতির অনায়াস ভালোবাসা। কবির অন্তরজাত সে উপলব্ধি আভাস :
সবাই মিলে
নতুন নতুন শহর গড়ব
নতুন নতুন গ্রাম বানাব
সবই নতুন
নতুন পথ আর নতুন বাহন
চলা ফেলার এক ব্যবস্থা।
[“আমার আমার” ‘মেঘ বলে চৈত্রে যাবো’]
ঈষৎ রোমান্টিকতার আবহ কখনো কখনো আহসান হাবীবের কবিতায় পরিদৃষ্ট। জীবনের স্বপ্ন সাধ পূরণে প্রিয়জনের সান্নিধ্য ও ভালোবাসা সংগ্রাম মুখর জীবনে বেঁচে থাকার অনুপ্রেরণা স্বরূপ। তাই স্মৃতির অনুভবে প্রিয়জনকে দিতে চেয়েছেন কখনো ফুল,কখনো গজমতির হার আবার কখনো জীবন সঙ্গিনীকে রানী বানানোর ইচ্ছেও ব্যক্ত করেছেন।
তোমাকে আমার রানী করে নেবো এই সাধ ছিলো
তোমাকে আমার ঘরণী বানাবো এই সাধ ছিলো
মনে সাধ ছিলো সঙ্গিনী হবে সখের মেলায়
তুমি মেতে গেল কালো অঞ্চলে
ভাত কুড়োবার মরণ খেলায়।
[“প্রিয়তমাসু” ‘বিদীর্ণ দর্পণে মুখ’]
আহসান হাবীব জীবন ও কাল সচেতন একজন আধুনিক কবি। আধুনিক নাগরিক জীবনের নৈঃরাশ্য হতাশা ব্যর্থতা ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের সংকটাপূর্ণ জীবনের চালচিত্র তাঁর লেখনি স্পর্শে অপূর্ব বাণীমূর্তি রূপে উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছে। পাশাপাশি সংকট উত্তরণে বেঁচে থাকার নতুন স্বপ্ন ও সম্ভাবনা তাঁর কাব্যে পরিব্যাপ্ত। ‘আশাই জীবন, জীবনের শ্রী’ এই মূলমন্ত্রেই ঘূণেধরা সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থার সকল বৈষম্যের অবসান ঘটিয়ে মধ্যবিত্ত শ্রেণির বেঁচে থাকার স্বপ্ন ও সম্ভাবনাকে তিনি উচ্চকিত রেখেছেন গভীর মমতায়,আন্তরিকতায় ও ভালোবাসায়।