জ্ঞানের দেবী সরস্বতী

1485875659
বেদে সরস্বতী প্রধানত নদীর অধিষ্ঠাত্রী দেবী। স্কন্দ পুরাণের প্রভাসখণ্ডে দেবী সরস্বতীর নদীরূপে অবতরণের কাহিনি বর্ণিত আছে। ওই কাহিনিতে নদী সরস্বতীর ভৌগোলিক অবস্থানকে পরস্ফুিট করা হয়েছে। বৈদিক জ্যোতিরূপা সরস্বতী ও নদী সরস্বতী সম্মিলিতভাবে জ্ঞানের দেবীরূপে পুরাণতন্ত্র ও সাহিত্যে বিপুল শ্রদ্ধা ও ভক্তির অধিকারিণী হয়েছেন। পুরাণে বলা হয়েছে—‘দেবী সরস্বতী আদ্যা প্রকৃতির তৃতীয় অংশজাত। তিনি বাক্য, বুদ্ধি, জ্ঞান, বিদ্যা প্রভৃতির অধিষ্ঠাত্রী দেবী। উক্ত গ্রন্থের মতে সরস্বতী পূজার প্রবর্তক ব্রহ্মা এবং শ্রীকৃষ্ণ।’ তবে পণ্ডিতেরা অনেকেই মনে করেন যে, সরস্বতী প্রথমে ছিলেন নদী, পরে হলেন দেবী। রমেশচন্দ্র দত্ত লিখেছেন—‘আর্য্যাবর্তে সরস্বতী নামে যে নদী আছে, তাই প্রথমে দেবী বলে পূজিত হয়েছিলেন। বর্তমানে গঙ্গা যেমন সনাতন ধর্মাবলম্বীদের উপাস্যদেবী হিসেবে পূজা করে থাকেন, তেমনি বিবর্তনের ধারায় সরস্বতী হলেন জ্ঞানের দেবী।’
সরস্বতীর প্রকৃত তাত্পর্য নিহিত রয়েছে সূর্যাগ্নির জ্যোতিতে। সূর্যাগ্নির তেজ, তাপ ও চৈতন্যরূপে জীবদেহে বিরাজ করায় চেতনা, জ্ঞানের প্রকৃত কর্ত্রী তো দেবী সরস্বতী। সরস্বতী দেবীর রূপান্তর হয়েছে পৃথিবীতে নদীরূপে এবং সরস্বতীই অগ্নি-ইন্দ্র-মরুত্ অশ্বিদ্বয়ের সংস্পর্শে শত্রুঘাতিনী, ধনদাত্রী এবং বৃহস্পতি-ব্রহ্মাণস্পতির বিদ্যাবত্তার সংযোগে নদী সরস্বতীর সঙ্গে অভিন্নরূপে সরস্বতী তীরে উচ্চারিত বৈদিকমন্ত্রে সংশ্লিষ্ট হয়ে পুরাণে বিদ্যা ও জ্ঞান ভিন্ন অপর জ্ঞানগুলো অন্যত্র স্থাপন করে হলেন বিদ্যাধিষ্ঠাত্রী।
শাস্ত্রীয় বিধান অনুসারে, শ্রীপঞ্চমীর দিন সকালে সরস্বতী পূজা সম্পন্ন করা হয়। সরস্বতীর পূজা সাধারণ পূজার নিয়মানুসারেই হয়। তবে এ পূজায় কয়েকটি বিশেষ উপাচার বা সামগ্রীর প্রয়োজন হয়। যেমন অভ্র-আবীর, আমের মুকুল, দোয়াত-কলম ও যবের শিষ। পূজার জন্য বাসন্তী রঙের গাঁদা ফুলেরও প্রয়োজন হয়। লোকাচার অনুসারে, ছাত্রছাত্রীরা পূজার আগে কুল খায় না। পূজার দিন কিছু লেখাও নিষিদ্ধ। যথাবিহিত পূজার পর লক্ষ্মী, নারায়ণ, লেখনী-মস্যাধার (দোয়াত-কলম), পুস্তক ও বাদ্যযন্ত্রেরও পূজা করার প্রথা প্রচলিত আছে। পূজা শেষে পুষ্পাঞ্জলি দেওয়ার প্রথাটি অত্যন্ত জনপ্রিয়। বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্রছাত্রীরা দল বেঁধে সরস্বতী পূজায় অঞ্জলি দিয়ে থাকে।
সরস্বতী দেবী হংসবাহনা। হংসের একটি বিচিত্রতা আছে। হংসকে দুধ ও জলের মিশ্রণ খেতে দিলে সে অনায়াসে জল রেখে সারবস্তু দুধ গ্রহণ করে। সার ও অসার মিশ্রিত এই জগত্ সংসারে মানুষ যেন সারবস্তু গ্রহণ করে এ নির্দেশই হংসবাহনতায় প্রকাশিত। দেবীর হাতের পুস্তক জ্ঞানচর্চার প্রতীক। জ্ঞানের মতো পবিত্র এ জগতে আর কিছুই নেই। এই জ্ঞান সব যোগের পরিপক্ব ফল। সংযতেন্দ্রিয় ও তত্পর হয়ে তত্ত্ব জ্ঞানে শ্রদ্ধাবান ব্যক্তি এই জ্ঞানলাভ করেন। সরস্বতী দেবীর হাতের বীণা সংগীতবিদ্যার প্রতীক। মনের ভাব প্রকাশ হয় ভাষায় আর প্রাণের ভাব প্রকাশ পায় সুরে। সুর মানুষকে বিমোহিত করে। প্রাণে আনন্দের সঞ্চার ঘটায়। সুরের লহরি সবাই শুনতে চায়, কিন্তু বেসুর কেউ শুনতে চায় না। দেবীর হাতের বীণা বেসুর সৃষ্টিকারী নয়।
সরস্বতী শ্বেত পদ্মের ওপর উপবিষ্টা। সাধকদের মতে, দেহে ছয়টি পদ আছে। বিশুদ্ধ পদে আরোহণ করলে সারস্বত জ্ঞান লাভ হয়। সরস্বতীকে পদ্মাসীনা দেখিয়ে দেহস্থ প্রাণবায়ুকে উত্তোলন করার কৌশল নির্দেশ করা হয়েছে। তিনি শুভ্রবর্ণা। তার এই শুভ্রবর্ণ শুচিতা, শুভ্রতা, শুদ্ধতা ও পবিত্রতার প্রতীক, যা আমাদের মনকে শুচি, শুভ্র ও শুদ্ধ রাখার নির্দেশ দিচ্ছে। কারণ মন শুদ্ধি না হলে চিত্ত শুদ্ধি হয় না আর চিত্ত শুদ্ধি ছাড়া জ্ঞানলাভ করা যায় না।
সরস্বতী দেবী জ্ঞানদায়িনী, সর্বশুক্লা। তিনি বাগদেবী, নিষ্কলা, নিত্যশুদ্ধা। তিনি প্রশস্ত বুদ্ধিদায়িনী ও মোক্ষদাত্রী। যুগ যুগ ধরে সনাতন ধর্মাবলম্বীর জ্ঞান, বিদ্যা ও ললিতকলার দেবী হিসেবে তিনি পূজিত হয়ে আসছেন।