ফেসবুক বন্ধে কেন হাত নিশপিশ করে?

বিষয়টি তারপরও ভাবায়। অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে বাংলাদেশের ফেসবুক ব্যবহারকারীরা সিঁদুরে মেঘ দেখলেই ডরাবেন। ২০১৫ সালের নভেম্বরে যুদ্ধাপরাধীদের মৃত্যুদণ্ডের রায়ের সময়ে সরকার তিন সপ্তাহ ফেসবুক বন্ধ রাখে। সেটা ছিল বাংলাদেশের অনলাইন জগতের জন্য এক মেঘাচ্ছন্ন সময়। সরকারের তরফ থেকে ইতিমধ্যে বাংলাদেশে ফেসবুক ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ আরোপের বেশ কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং এখনো সেসব জারি আছে। ফেসবুক কর্তৃপক্ষ সাড়া না দেওয়ায় সরকারের সব ইচ্ছা পূরণ হয়নি। এখনো ফেসবুক-ব্লগ ইত্যাদি বন্ধের জন্য অনেকেরই হাত নিশপিশ করে। উগ্র ধর্মীয় গোষ্ঠীর তরফ থেকে এমন দাবি আছে। সরকারের ভেতরের রক্ষণশীল অংশও বিভিন্ন সময়ে এমন ধাতের কথা বলেন। সর্বশেষ জেলা প্রশাসকদের সম্মেলনে ডিসিদের পক্ষ থেকে এ রকম দাবি তোলা হয়। দাবির ভিত্তি হচ্ছে এই যুক্তি যে, গভীর রাত পর্যন্ত ফেসবুক ব্যবহারের ফলে ছাত্রছাত্রী ও তরুণ-তরুণীদের পড়ালেখায় বিঘ্ন ঘটছে। শিশুরা গভীর রাত পর্যন্ত কার্টুন দেখছে। এতে তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ ব্যাহত হচ্ছে।
যুক্তিটা যেহেতু উঠেছে, তাই এ নিয়ে আলোচনা হওয়া দরকার। নইলে বারবার এ ধরনের কানা যুক্তি আমাদের বিযুক্ত করবার জন্য তোলা হবে। প্রথম কথা হলো, এ অভিযোগের পেছনে কোনো জরিপ বা অনুসন্ধানের কথা এখন পর্যন্ত জানা যায়নি। কথাটা আংশিক সত্য হতে পারে। অনেক ছাত্রছাত্রীরই রাত জেগে ফেসবুক করার বিষয়টি সম্পূর্ণ নির্দোষ না। তবে শিশুদের পক্ষে বাবা-মায়ের চোখ এড়িয়ে একা একা রাত জেগে ফেসবুক করার সুযোগ খুব কম। এখনো অধিকাংশ শিশুই ফেসবুকের আওতার বাইরে। উল্লেখযোগ্য–সংখ্যক কিশোর-কিশোরীর ফেসবুক অ্যাকাউন্ট আছে। তারা যদি রাত জেগে অনলাইনে আসতে চায়, তাহলে ফেসবুক ছাড়া আরও অনেক উপায় তাদের রয়েছে। বিকল্প পথে বন্ধ থাকা ফেসবুকে ঢুকবার উপায়ও তারা দ্রুতই রপ্ত করে ফেলতে পারবে। সবচেয়ে ভয়াবহ হবে, যদি ফেসবুক না পেয়ে তারা অনলাইনে সহজলভ্য সোসাইটি সময় কাটাতে বসে! ফেসবুক বন্ধ করে তাদের সেদিকে ঠেলে দেওয়ার মানে হয় না। সুতরাং, জেলা প্রশাসকদের একটা অংশও যদি রাত বারোটা-ছয়টা ফেসবুক বন্ধের পক্ষে মত দিয়ে থাকেন, তাঁদের উচিত মতটা যুক্তির ধামার তলায় চাপা দিয়ে রাখা। এ ধরনের নিয়ন্ত্রণের ফল সর্বদাই বুমেরাং হয়। বরং সমস্বরে ফেসবুকের কাছে শিশু–কিশোরদের জন্য িকছু িকছু সুযোগ সীমিত করার দাবি তোলা যেতে পারে।
সমস্যা আছে যখন তখন গোড়ায় হাত দিন না! নিয়ন্ত্রণ করে সবকিছু সামাল দেওয়া যাবে না। আমাদের শিশু-কিশোরেরা কেবল মা-বাবার সন্তান নয়। তারা বেড়ে ওঠে পরিবারে, বিদ্যালয়ে। তারা প্রভাবিত হয় গণমাধ্যম এবং সামাজিক জলবায়ু দিয়ে। এসব পরিসরে এমন সংস্কৃতির বিকাশ ঘটাতে হবে, যেখানে নতুন প্রজন্ম নিজে থেকেই তার ভালো–মন্দ বুঝতে শিখবে। তাদের বোঝাবার জন্য আগে তো তাদের মনটা বুঝতে হবে। সেই সময় কি আমরা দিই? আমরা কি তাদের জন্য আনন্দদায়ক সমাজ-শহর-গ্রাম ও পরিবেশ দিতে পারছি? আমরা কি তাদের আনন্দ ও উত্তেজনা প্রকাশের জন্য সুস্থ উপায় তৈরি করে রেখেছি? রেখেছি মাঠ? রেখেছি আনন্দদায়ক বিদ্যায়তন, রেখেছি নিরাপদ সড়ক, রেখেছি দলবদ্ধ মেলামেশা ও শিশুসুলভ রোমাঞ্চের সুযোগ?
রাত বারোটার পরে কার্টুন চ্যানেল বন্ধ করবেন? কিন্তু আজকাল তো কিশোর-কিশোরীরাও হিন্দি সিরিয়াল দেখে, বলিউডি ধামাকা নাচ-গান দেখে। রিয়েলিটি শোর টার্গেট তো তারাও। শ খানেক ভারতীয় চ্যানেলের অনেকটিতে এমন নাচ-গান ও শো চলে, যা চিত্তকে নয়, জাগায় কামনাকে। কিছু ব্যতিক্রম বাদে প্রায় প্রতিটি বলিউডি সিনেমায় আইটেম গান নামের এক বস্তু আছে। এসব গানের নর্তকীদের বলা হয় আইটেম গার্ল। এসব সিনেমার নায়কেরাও সাধারণত হন প্রবল পুরুষ, বাংলায় যাকে আমরা বলি ব্যাটা, ইংরেজিতে বলে মাচো। হিন্দি চ্যানেলের রিয়েলিটি শোরই আরেক নমুনা। একটি অবুঝ শিশু যখন কোনো আইটেম গানের আইটেম গার্লের মতো সেজে ও পোশাক পরে হুবহু সেভাবেই নাচে, তখন তাকে কি আর নিরীহ বিনোদন বলা সম্ভব? দুটি বালক-বালিকাকে প্রেমঘন গানে ও সেমতো অভিনয় করালে তাদের মনেই-বা কী ক্রিয়া হয়, আর দর্শকদের মধ্যেই-বা কী প্রতিক্রিয়া হয়? এভাবে শিশুদের একাধারে ‘খুদে প্রাপ্তবয়স্ক’ বানিয়ে বড়দের ‘আনন্দের পুতুল’ হিসেবে পরিবেশন করা হয়? এটাও কি একধরনের অ্যাবিউজ নয়? এভাবে জনসংস্কৃতিতে বিনোদনের যে রেশমি ফাঁস পাতা থাকছে, তাতে পতঙ্গের মতো অনেকেই গিয়ে আটকাতে পারে। এসবের বেলায় কী করণীয় তা ভেবেছেন কি কেউ?
তা ছাড়া ফেসবুক বিষয়টা বোঝাতে সম্ভবত আমাদের ঘাটতি আছে। শুরুতে এটা ছিল নিছক একটা সামাজিক মাধ্যম। তারপর এটা হয়ে পড়ল বৈশ্বিক অনলাইন পাটাতন। এখন ফেসবুক নিজেই একটা বিকল্প বাস্তবতা। বাংলাদেশে প্রায় আড়াই কোটি ফেসবুক ব্যবহারকারী আছে। এদের বড় অংশের জন্যই ফেসবুক ছাড়া বাস্তবতা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। একসঙ্গে এখানে যোগাযোগ, বিনোদন, খবর, ছবি, তথ্যসূত্রসহ হেন কিছু নেই যা পাওয়া যায় না। ফেসবুক আর গুগল যতই অন্তরঙ্গ হচ্ছে, ততই এই মাধ্যমটা হয়ে পড়ছে জানাশোনা, মেলামেশা, পড়ালেখা, জ্ঞান ও রোমাঞ্চভুক মানুষের অবিকল্প মাধ্যম। এটা এখন এমন এক হাইওয়ে, যা সবচেয়ে গতিশীল এবং সবচেয়ে বেশি অনলাইন চলাচলকারী এ পথেই পা বাড়ান।
ফেসবুক এক ঘণ্টার জন্য বন্ধ হওয়ার আর্থিক ক্ষতিও কম নয়। অনেক ব্যক্তি উদ্যোগ ও প্রতিষ্ঠানের লোকজনের জন্য রাতের বেলায় যোগাযোগের জানালাটা খোলা রাখতেই হয়। আমাদের দেশে যখন রাত, তখন দুনিয়ার অনেকখানেই কর্মব্যস্ত দিন। ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি রাজীব আহমেদ বলেছেন, ফেসবুকনির্ভর ই-কমার্সের যোগাযোগ মূলত রাতেই বেশি হয়। সে সময় ফেসবুক বন্ধ থাকলে ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। এক সমীক্ষা বলছে, প্রতি মাসে ফেসবুকের মাধ্যমে বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ২০০ কোটি টাকা। আর ৩০ শতাংশ স্থানীয় ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড হয় ফেসবুকের মাধ্যমে। তাঁরা নিজেরা বিকল্প মাধ্যমে গেলেও কী করে তাঁদের ক্রেতা ও ব্যবসায়িক সহযোগীদের বিকল্পের দিকে ঠেলবেন?২০১৫ সালে তিন সপ্তাহ ফেসবুক বন্ধ রাখার কথা ভাবলে ফেসবুকনির্ভর ব্যবসায়ীদের কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ পড়ে। এই সাময়িক নিষেধাজ্ঞার গুণে বাংলাদেশ ইতিমধ্যে মাত্র চার দেশের একটি হয়েছে, যারা কিছু সময়ের জন্য ফেসবুক বন্ধ করেছে। বাকি দেশগুলো হলো ইরান, চীন, উত্তর কোরিয়া। ওই তিনটি দেশের গণতন্ত্র প্রশ্নবিদ্ধ বটে, তবে কি বাংলাদেশও শাসনপদ্ধতির দিক থেকে তাদের পথেই হাঁটছে? জাহাজ আবিষ্কৃত হওয়ার সঙ্গে জাহাজডুবি আবিষ্কৃত হয়, তেমনি ফেসবুকের সঙ্গে চলে আসে এর কুপ্রভাবও। কুপ্রভাব মোকাবিলার শত উপায় আছে, কিন্তু জানালা-দরজা খোলা রেখেই তা করা ভালো। ইতিমধ্যে রাজপথ, সংসদসহ মতপ্রকাশের অনেক দরজা-জানালাই সংকুচিত করা হয়েছে। ফেসবুক িনয়ন্ত্রণে জঙ্গিদের সুবিধা হবে। যোগাযোগের জন্য তাদের ফেসবুক দরকার নেই। কিন্তু সমাজের মানসিক স্বাস্থ্য যোগাযোগের জন্য আমাদের এই িডজিটাল মহাসড়ক চাই।
মুক্তিযুদ্ধের সেই গানটাই মনে করাই, ‘সব কটা জানালা খুলে দাও না’।