নগরবাড়ীতে ছড়িয়ে পড়ছে কয়লার গুঁড়া, হুমকিতে জনজীবন

Pabna-bera-Nagarbari-Coal-powder

পাবনার বেড়া উপজেলার নগরবাড়ী ও রঘুনাথপুরে যমুনা নদীর কোল ঘেঁষে বেড়ে ওঠা কয়েক শ’ বছরের পুরানা আবাসিক পল্লীতে কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যবসায়ী গড়ে তুলেছেন কয়লার আড়ৎ।

সব ধরনের নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করে সড়কের পাশে খোলা জায়গায় এবং ফসলি জমি দখল করে জমা করে রাখা কয়লার গুঁড়ো বাতাসে ছড়িয়ে পড়ায় এ এলাকার কৃষি-পরিবেশ ও জনজীবন হুমকির মুখে পড়েছে।

যমুনার নির্মল বাতাসে এখন শুধুই পিট কয়লার পোড়া গন্ধ। একই সঙ্গে ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে কাজ করায় কয়লা শ্রমিকরা তাদের অজান্তেই ক্যান্সার ও যক্ষাসহ মারাত্মক রোগের ঝুঁকি বহন করে চলেছে। শ্বাস কষ্টে ইতোমধ্যেই এলাকার অনেক নারী পুরুষ ও শিশু অসুস্থ হয়ে পড়েছে।

নগরবাড়ী ঘাট সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা গেছে, নগরবাড়ী ঘাট থেকে শুরু করে রঘুনাথপুর গ্রাম পর্যন্ত ১ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে রাস্তার দু’পাশে শুধু কয়লার স্তুপ। কয়লার গুড়া ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বা উড়ে গিয়ে রাস্তায় মোটা আস্তরন ফেলাসহ আশেপাশের গাছগুলোর পাতা পর্যন্ত কালো রং করে ফেলেছে।

লোড-আনলোডের সময় ছাড়াও সামান্য একটু বাতাসেই কয়লার ডাস্ট বা গুড়ো ছড়িয়ে পড়ছে পার্শ্ববর্তী ফসলি জমিতে, বাড়ি-ঘরে ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে।

কয়লা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, যশোরের নওয়াপাড়া গ্রুপ ইন্দোনেশিয়া থেকে চট্টগ্রামে কয়লা আমদানি করে থাকে। আমদানিকৃত কয়লা সেখান থেকে কার্গো জাহাজের মাধ্যমে নগড়বাড়ী নৌবন্দরে আসছে। এরপর পাবনার ব্যবসায়ীরা কয়লা কিনে নগড়বাড়ীতে ব্যবসা করছে। এখানে কয়লার ব্যবসা করছে নওয়াপাড়া ট্রেডার্সসহ স্থানীয় কমপক্ষে সাত জন কয়লা ব্যবসায়ী। তারা উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন ইট ভাটাতে প্রতিটন গড়ে ছয় হাজার টাকা দরে এ কয়লা বিক্রি করছে। কয়লা ব্যবহারকারীদের আগে যেখানে সিলেট থেকে কয়লা কিনতে হত এখন তারা হাতের কাছে কয়লা পাওয়ায় এখানেই ভিড় করছেন।

কয়লার চাহিদা বাড়ায় একদিকে আমদানি বাড়ছে আর অন্যদিকে বাড়ছে কয়লার স্তুপ। ধীরে ধীরে রাস্তার পাশে ফসলি জমিতে নতুন নতুন কয়লার স্তুপ স্থাপন করা হচ্ছে। কাঁচা টাকার লোভে অনেক চাষি তাদের জায়গা ভরাট করে দিচ্ছেন কয়লা রাখার জন্য। আবার ফসল উৎপাদন নষ্ট হওয়ায় অনেকে বাধ্য হয়ে জমি লিজ দিচ্ছেন। এতে কৃষি জমি ভয়াবহ আগ্রাসনের মুখে পড়েছে।

রঘুনাথপুর গ্রামের বাসিন্দা জালাল মোল্লা (৫৬), ময়েন মোল্লা (৮০), ই্উনুছ আলী (৬৫), আফাজ সরদার (৭০) ও শের আলী(৭৫) জানালেন, কয়লার ধুলা ও ঝাঁঝালো গন্ধের কারণে রাস্তায় আমাদের গ্রামের লোকজন চলেন নাকে রুমাল চেপে। রিকসা-ভ্যান ছাড়া এ সড়কে পায়ে হেটে চলাচল করাও অসম্ভব হয়ে পড়েছে। তারা বলেন, দু’শ বছরের প্রাচীন রঘুনাথপুর গ্রামটি কিছু লোভী লোকের কারণে আজ বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। তারা দুঃখ করে বলেন, আমাদের কি এ গ্রাম ছেড়ে চলে যেতে হবে?

তারা জানান, এ অবস্থা বন্ধ না হলে অনেকেই বাপ দাদার ভিটে ছেড়ে অন্যত্র চলে যাবেন।

রঘুনাথপুর গ্রামের বাসিন্দা শাজাহান সেখ বলেন, আমার বাচ্চারা পড়ে হরিনাথপুর মডেল হাইস্কুলে। কিন্তু তারা এ পথ দিয়ে চলতে পারছে না।

একই কথা বললেন, ইফাত সেখ ও সাঈদ সেখ। তাদের মেয়েরা কাশীনাথপুর মহিলা কলেজে পড়ে। রঘুনাথপুর গ্রামের ৮ম শ্রেণির স্কুলছাত্র ইমন বলল, এখানে কয়লার কারবার গড়ে ওঠায় আমাদের স্কুলে যাওয়ার পথটাই বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। সব সময় বাস- ট্রাকের দাপাদাপিতে বাড়িতে পড়াশোনা করাটাও কষ্টকর হয়ে পড়েছে।

প্রতাপপুরের বাসিন্দা শফিক আহমেদ বলেন, নদীর পাশের গ্রামটিতে আজ একটু বিশুদ্ধ শ্বাস নেয়ার জন্য আমাদের হাসফাঁস করতে হচ্ছে। যমুনার নির্মল বাতাসে এখন শুধুই পিট কয়লার পোড়া গন্ধ।

শ্রমিক আল আমীন, হাতেম আলী এবং হাজেরা খাতুন ও তার সঙ্গীরা বলেন, কয়লা খালাস করায় ক্যান্সার ও যক্ষারোগ হতে পারে সেটা তারা জানেন না। অভাবের তাড়নায় ঘাটে শ্রম বিক্রি করে সংসার চালান তারা।

নগরবাড়ী বণিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান এএম রফিক উল্লাহ বলেন, সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হলেও আমার একার পক্ষে এটি বন্ধ করা সম্ভব নয়।

বেড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শামসুন্নাহার সুমীর সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, বিষয়টি আমার জনা ছিল না। আমি খোঁজ নিয়ে দেখছি।

পাবনা বক্ষব্যাধি (টিবি) হাসপাতালের কনস্যালট্যান্ট চিকিৎসক মাসুদুর রহমান বলেন, যক্ষা বায়ুবাহিত একটি রোগ। ধূলা-বালি বা যেকোনো দ্রব্যের গুড়া (ডাস্ট) নিশ্বাসের সঙ্গে ফুসফুসে গিয়ে আটকা পড়ে। ফুসফুসের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ছিদ্রগুলো ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এতে শ্বাস-প্রশ্বাসে কষ্টের পাশাপাশি কাঁশি শুরু হয়ে থাকে। অল্প কিছুদিনের মধ্যে সেটা যক্ষার রুপ ধারণ করে থাকে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর পাবনার উপপরিচালক বিভুতি ভুষণ সরকার বলেন, জমিতে কয়লার স্তর জমলে অবশ্যই ফলন কম হবে। কারণ মাটি এতে ঠিকমতো প্রাকৃতিক খাদ্য ও বাতাস থেকে প্রয়োজনীয় উপাদান গ্রহণ করতে পারবে না। ফলে গাছ বিবর্ণ হতে পারে এবং ফলন কমে যেতে পারে।

পরিবেশ অধিদফতরের সনদ নিয়ে নিয়ম অনুযায়ী আবাসিক এলাকা বাদ দিয়ে সংরক্ষিত এলাকায় এ ব্যবসা করা দরকার বলে মন্তব্য করেন তিনি।