যুগে যুগে ভাষণ ইতিহাসের পাতায় :: বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ বিশ্বসম্পদ

৭ মার্চের ভাষণ

যুগে যুগে বিশ্বের নির্যাতিত, নিষ্পেষিত, অধিকারবঞ্চিত মানুষের ত্রাণকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন জনাকয়েক মহাপুরুষ। শাসকের রক্তচক্ষু, নির্যাতন, জেল-জুলুম এমনকি মৃত্যুকে উপেক্ষা করে তাঁরা কেবল সংগ্রামই করেননি তাঁদের অপূর্ব বক্তৃতার দ্বারা মানুষকে উজ্জীবিত করেছেন। তাঁদের সংগ্রামী আহ্বানে নির্যাতিত, নিষ্পেষিত মানুষগুলো জীবন দিতেও কুণ্ঠাবোধ করেনি। তাঁদের একটি ভাষণ পাল্টে দিয়েছে একটি দেশের মানচিত্র, জাতীয় পতাকা, জাতীয় সংগীত। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান তাদেরই একজন।অসংখ্য বক্তৃতার মাঝে কোনো একটি বক্তৃতা ঐতিহাসিক ভাষণ হিসেবে ঠাঁই করে নিয়েছে ইতিহাসের পাতায়। তবে এর সংখ্যা খুব বেশি নয়।

  • পেট্রিক হেনরির ‘আমাকে স্বাধীনতা দাও, নয়তো মৃত্যু।’

পেট্রিক হেনরি

১৭৭৫-এর ২৩ মার্চ তৎকালীন ভার্জিনিয়া রাজ্যের শাসক পেট্রিক হেনরি রিমেন্ডের সেন্ট জন চার্চে উপস্থিত স্থানীয় নেতা আমেরিকার পরবর্তী প্রেসিডেন্ট থমাস জেফারসন ও জর্জ ওয়াশিংটন এবং সর্বস্তরের জনগণের উদ্দেশে ব্রিটিশ আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে স্বাধীনতার ডাক দেন। যুগ যুগ ধরে বিপ্লবের যে চেতনা ভার্জিনিয়াবাসীর হৃদয়ে ছাইচাপা আগুনের মতো জ্বলছিল, তাই যেন স্ফুলিঙ্গ হয়ে ধরা দেয় পেট্রিক হেনরির সাহসী এক উচ্চারণে। তাঁর ভাষণের শেষ পর্যায়ে তিনি ছুড়ে দেন এক ঐতিহাসিক প্রশ্ন, ‘জীবন কি এতই প্রিয় আর শান্তি কি এতই মধুর যে, শিকল আর দাসত্বের দামে তাকে কিনতে হবে?” এ প্রশ্নের সঘোষিত উত্তরই যেন তাঁর অমর বাণী। আমি জানি না অন্যরা কোন পথ বেছে নেবে। কিন্তু আমার ক্ষেত্রে বলব, ‘আমাকে স্বাধীনতা দাও, নয়তো মৃত্যু।’ পেট্রিক হেনরির এই আবেদনে ব্যাপক সাড়া ফেলে উপস্থিত জনতার মাঝে। বৃথা যায়নি হেনরির সাহসী উচ্চারণ।

 মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র’র  বিখ্যাত ভাষণ ‘আই হ্যাভ এ ড্রিম’

মার্টিন লুথার কিং

নিগ্রোদের অধিকার আদায়ে আপসহীন সংগ্রাম চালিয়ে গেছেন আফ্রিকান মার্কিন মানবাধিকার কর্মী মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র। আমেরিকায় মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় অহিংস আন্দোলনের জন্য ১৯৬৪ সালে তিনি শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পান। তাঁর বিখ্যাত ভাষণ ‘আই হ্যাভ এ ড্রিম’ ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ ভাষণগুলোর একটি। তিনি তাঁর ভাষণের একপর্যায়ে বলেছেন, ‘আমি স্বপ্ন নিয়ে এসেছি। একদিন অ্যালাবামায় ছোট কৃষ্ণাঙ্গ বালক-বালিকারা শ্বেতাঙ্গ বালক-বালিকাদের হাত মেলাবে ভাইবোনের মতো। একদিন প্রতিটি উপত্যকা উন্মুক্ত হবে। জানি মুক্তি আমাদের আসবেই। সেই দিন খুব বেশি দূরে নয় এবং সেই দিন ঈশ্বরের সব সন্তান গেয়ে উঠবে ‘এ আমার দেশ, স্বাধীনতার স্বর্গভূমি। স্বাধীনতার ঘণ্টা বাজতে থাকুক আমেরিকাজুড়ে।’ তাঁর এ স্বপ্ন সফল হয়েছে, সার্থক হয়েছে তাঁর সংগ্রাম।

প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন’র বিখ্যাত উক্তি ‘Government of the people, by the people, for the people

প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন

১৮৬১ সালে গৃহযুদ্ধ কালে তাঁর অবদানের কারণে দ্বিখণ্ডিত হওয়ার হাত থেকে রক্ষা পায় আমেরিকা। ১৮৬৩ সালের ১৮ নভেম্বর গেটিসবার্গে তিনি যে ভাষণ দেন সেটিই ঐতিহাসিক গেটিসবার্গের ভাষণ নামে খ্যাত- যা আমেরিকার জন্য এক মূল্যবান দলিল। প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন তাঁর ভাষণে স্বাধীনতার জন্য আত্মোৎসর্গকারীদের অবদানকে স্মরণ করে বলেন, ‘আমরা এখানে যাই বলি না কেন পৃথিবী হয়তো সেটি বেশিদিন স্মরণ রাখবে না। দৃষ্টিও দেবে খুব সামান্য। কিন্তু আমাদের বীর সন্তানদের কার্যকলাপ কখনো স্মৃতির পাতা থেকে বিস্মৃত হবে না বরং তাদের অসমাপ্ত কাজ সম্পন্ন করার জন্য আমাদের বেঁচে থাকতে হবে। নিজেদের উৎসর্গ করতে হবে প্রতিনিয়ত। আমাদের বীর সন্তানরা নিষ্ঠার জন্য চরম মূল্য দিয়ে গেছেন। আমাদের উচিত সেই নিষ্ঠা মনের মধ্যে লালন করা।’ এখান থেকে আজ আমরা দৃঢ় সংকল্প গ্রহণ করব যাতে তাদের আত্মত্যাগ বৃথা না যায়। যেন এই জাতি বিধাতার কৃপায় স্বাধীনতার নবজন্ম লাভ করে। তাঁর বিখ্যাত উক্তি ‘Government of the people, by the people, for the people’ গেটিসবার্গের ভাষণেরই অংশ।

জন এফ. কেনেডি

মার্কিন রাষ্ট্রপতি জন এফ. কেনেডির সংসদে উদ্বোধনী ভাষণ মার্কিনিদের কাছে আর এক মূল্যবান দলিল। মহান স্বাধীনতা দিবস উদযাপন করতে গিয়ে তিনি বলেন, আজ আমাদের এটা ভুলে যাওয়ার স্পর্ধা করা উচিত নয় যে, আমরা সেই প্রথম বিপ্লবের উত্তরাধিকারী। আজ এই সময় এই স্থান থেকেই বন্ধু-শত্রু উভয়ের নিকটেই এই বার্তা সমানভাবে পৌঁছে যাক যে, সেই মশাল এমন এক নতুন প্রজšে§র আমেরিকানদের কাছে হস্তান্তরিত হয়েছে যারা এই শতাব্দীতে জšে§ছেন, যুদ্ধের আগুনে দগ্ধ হয়ে দৃঢ় হয়েছেন, একটি কঠোর ও তিক্ততাপূর্ণ শান্তির দ্বারা শৃঙ্খলাবদ্ধ হয়েছেন এবং যারা প্রাচীন ঐতিহ্যের বিষয়ে গর্ববোধ করেন…। তিনি আরো বলেন, বিশ্বের অর্ধেক স্থানের গ্রামে ও কুঠিরে বসবাসরত যে সব মানুষ গণদুর্দশার বন্ধন ছিঁড়ে বেরিয়ে আসতে লড়াই করেছেন তাদের উদ্দেশে আমরা অঙ্গীকার করছি যে, যত সময়ের প্রয়োজন হোক না কেন তারা যাতে নিজেরাই নিজেদের সাহায্য করতে পারেন সেই জন্য আমরা তাদের সাহায্য করার সেরা প্রয়াস করব-যত সময় ধরেই প্রয়োজন হোক না কেন? কমিউনিস্টরা তাদের সাহায্য করেছে সেই কারণে নয় কিংবা তাদের ভোট চাওয়ার জন্যও নয়, কারণ এটা তাদের অধিকার। একটি স্বাধীন সমাজ যদি অগণিত দরিদ্র মানুষকে সাহায্য করতে না পারে, তাহলে তারা ধনী ব্যক্তিদেরও বাঁচাতে পারবে না।

উইনস্টল চার্চিল

উইনস্টল চার্চিল সামরিক ও রাজনৈতিক জীবনে অসংখ্যবার ভাষণ দিলেও ১৯৪০ সালের ১৩ মে ইংল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রথম ভাষণটি উইনস্টল চার্চিলকে স্মৃতির পাতায় অমর করে রেখেছে। এই ভাষণ ইংল্যান্ডের রাজনীতিতে আমূল পরিবর্তন আনে। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে উইনস্টল চার্চিলের আগ্রাসী ভূমিকা এবং জার্মানির প্রতি নেতিবাচক মনোভাবের কারণে জার্মানির সঙ্গে যে কোনো আপসের ক্ষেত্রে সরাসরি বিপক্ষে অবস্থান করেন। তার ঐতিহাসিক ভাষণে বলেন, যারা এই সরকারে মন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন তাদের আমি বলেছি আর এই মহান সংসদকেও বলছি, দেয়ার মতো আমার কিছু নেই। আছে শুধু রক্ত, কষ্ট, শ্রম আর ঘাম। আমাদের সামনে অগ্নিপরীক্ষা, আমাদের মাসের পর মাস যুদ্ধ করতে হবে আর কষ্ট করতে হবে। …যদি প্রশ্ন কর আমাদের লক্ষ্য কী, তবে শুনে রাখো একমাত্র বিজয় ছাড়া আমাদের আর কোনো লক্ষ্য নেই। পথ যতই দীর্ঘ কিংবা কঠিন হোক বিজয় ছাড়া আমরা অন্য কিছু ভাবছি না। বিজয় ছাড়া আমাদের কোনো পথ খোলা নেই। তার এ ভাষণ ইংল্যান্ডবাসীকে এমনভাবে উদ্বুদ্ধ করেছিল জার্মানদের পরাজিত না করে তারা ঘরে ফেরেনি।

মহাত্মা গান্ধীর ভারত ছাড় বা কুইট ইন্ডিয়া বক্তৃতা

মহাত্মা গান্ধী

১ সেপ্টেম্বর ১৯৩৯ সালে শুরু হওয়া দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ তখন মাঝপথে। বিশ্বযুদ্ধের দাবানলে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে মানবসভ্যতা, বাজছে যুদ্ধের দামামা। কেউ লড়ছে গণতন্ত্র রক্ষায়, কেউ নিজ ভূখণ্ড রক্ষায়, আগ্রাসী শক্তি লড়ছে একের পর এক দেশ জয়ের নেশায়। এমন এক প্রেক্ষাপটে তৎকালীন ভারতবর্ষে দেখা গেল এক বিপরীত চিত্র। হিংসা নয়, বিদ্বেষ নয়, আক্রমণ নয়- ত্যাগ আর ভালোবাসাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে ভারতবর্ষের স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে এক অভূতপূর্ব সংগ্রামের ডাক দিলেন মহাত্মা গান্ধী। ব্রিটিশপণ্য বর্জনের উদাহরণ সৃষ্টি করতে ইংল্যান্ডের স্যুট-কোট ফেলে গায়ে তুলে নেন দেশীয় চরকায় বোনা তাতের ধুতি আর চাদর। অনেকেই তখন ভেবেছিলেন গান্ধীর দর্শনে মহাপরাক্রমশালী ব্রিটিশদের কখনো বিতাড়ন করা যাবে না। তারা মনে করতেন ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামের বিকল্প নেই। কিন্তু গান্ধী তার অহিংস আন্দোলনের প্রতি ছিলেন অবিচল। শত-সহস্র প্রতিকূলতা এবং হুমকির মুখেও নিজ দর্শন থেকে এক চুলও নড়েননি মহাত্মা গান্ধী। ১৯৪৭ সালের ৮ আগস্ট তৎকালীন বোম্বের গাওলিয়া ট্যাক ময়দানে তিনি ব্রিটিশদের ভারত ছেড়ে যাওয়ার আহ্বান জানান যা ভারত ছাড় বা কুইট ইন্ডিয়া বক্তৃতা নামে ইতিহাসে ঠাঁই করে নিয়েছে।

নেলসন ম্যান্ডেলা  সর্বগ্রাসী বর্ণবাদের বিরুদ্ধে সফল সংগ্রামের এক নাম। কৃষ্ণাঙ্গ এই নেতার মূল সংগ্রাম ছিল কৃষ্ণাঙ্গদের ওপর শেতাঙ্গের বর্ণবাদী আচরণের বিরুদ্ধে। শাসকের রক্তচক্ষু, নির্যাতন, জেল-জুলুম এমনকি মৃত্যুকে উপেক্ষা করে তিনি কেবল নিজেই সংগ্রাম করেননি বরং তার অপূর্ব বক্তৃতার দ্বারা উজ্জীবিত করেন পৃথিবীর সব শোষিত মানুষকে। তাই ম্যান্ডেলা কেবল দক্ষিণ আফ্রিকার নেতা নন, যে কোনো অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে আন্দোলনের এক সার্থক প্রতীক, এক অনন্য প্রতিষ্ঠান। রাজনৈতিক জীবনে তিনি বহু ভাষণ দেন যা একাধিকবার শাসকদের ভিত কাঁপিয়ে তোলে। কখনো সংগ্রাম, কখনো আত্মত্যাগ, কখনো বা একাত্মতার জন্য ক্ষমা করার আহ্বান সংবলিত তার প্রতিষ্ঠিত ভাষণ ইতিহাসের মূল্যবান সম্পদ। তবে ১৯৫৩ সালের ২১ সেপ্টেম্বর আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেসের সভাপতি হিসেবে নেলসন ম্যান্ডেলার বক্তৃতাটি ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছে। ছন্দময় এবং কাব্যিক এই বক্তৃতায় ম্যান্ডেলা শত প্রতিকূলতার মাঝেও জনগণের রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং নিজেদের শক্তি সম্পর্কে সচেতনতাকে তাদের জন্য এক বিজয় বলে উল্লেখ করেন। সবচেয়ে বড় বিজয় বা স্বাধীনতার কথা বলতে গিয়ে ম্যান্ডেলা উল্লেখ করেন তার অমর বাণী ‘স্বাধীনতা অর্জনের কোনো সহজ পথ নেই।’

বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান

ইতিহাসবিদ এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, পৃথিবীর সাড়া জাগানো ভাষণগুলোর মধ্যে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ সর্বশ্রেষ্ঠ ভাষণ হিসেবে বিবেচিত। ১৮ মিনিটের সেই ঐতিহাসিক ভাষণটি ছিল যেমন ছন্দময় এবং কাব্যিক তেমনি ছিল হৃদয়গ্রাহী ও মর্মস্পর্শী। ১৯৭১-এর ৭ মার্চের ভাষণটি বিশ্লেষণ করে মার্কিন ম্যাগাজিন নিউজ উইক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘রাজনৈতিক কবি’ উপাধি দিয়েছে। ১৯৭১ সালের অগ্নিঝরা মার্চের ৭ তারিখে বঙ্গবন্ধুর দেয়া সেই ঐতিহাসিক ভাষণকে ‘বিশ্বের প্রামাণ্য ঐতিহ্য’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থা (ইউনেসকো)। ফলে বঙ্গবন্ধুর সেই ভাষণ ইউনেসকোর ‘মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড ইন্টারন্যাশনাল রেজিস্টার’ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এটা বাঙালি জাতির জন্য এক পরম পাওয়া। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ আজ শুধু বাঙালি জাতির সম্পদ নয়, বিশ্বসম্পদ। বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চের ভাষণের শুরুতেই বলেন, ‘আজ দুঃখ ভারাক্রান্ত মন নিয়ে আপনাদের সামনে হাজির হয়েছি। আপনারা সকলেই জানেন এবং বুঝেন আমরা জীবন দিয়ে চেষ্টা করেছি। কিন্তু দুঃখের বিষয় আজ ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, রংপুরে আমার ভাইয়ের রক্তে রাজপথ রঞ্জিত হয়েছে। আজ বাংলার মানুষ মুক্তি চায়, বাংলার মানুষ বাঁচতে চায়, বাংলার মানুষ অধিকার চায়।’ এরপর পাকিস্তান শাসনামলের ২৩ বছরের বাংলার মানুষের রক্ত দিয়ে রাজপথ রঞ্জিত করা ইতিহাস, বাংলার মুমূর্ষু নর-নারীর আর্তনাদের ইতিহাস তুলে ধরার পাশাপাশি ’৫২-এর ভাষা আন্দোলন ’৫৪-এর যুক্তফ্রন্ট ’৫৮-এর সামরিক শাসন ’৬৬-এর ছয় দফা ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান ’৭০-এর নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পরও ক্ষমতা হস্তান্তর না করার ষড়যন্ত্রের কথা তুলে ধরেন তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণে।

বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণটি ছিল মূলত স্বাধীনতার প্রস্তুতিমূলক ভাষণ। বঙ্গবন্ধু ভালো করেই জানতেন, সামরিক জান্তা ইয়াহিয়া খান শান্তিপূর্ণ উপায়ে ক্ষমতায় হস্তান্তর করবে না। তাই গণতান্ত্রিক উপায়ে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার কোনো বিকল্প নেই। সরাসরি স্বাধীনতা ঘোষণা করলে বঙ্গবন্ধুকে বিছিন্নতাবাদী নেতা হিসেবে আখ্যায়িত করে ইয়াহিয়া খান বিশ্বজনমত তাদের পক্ষে নেয়ার চেষ্টা করবে। বঙ্গবন্ধু সে সুযোগ দেননি। অত্যন্ত ঠাণ্ডা মাথায় বিজ্ঞ রাজনীতিকের মতো জাতিকে দিক-নির্দেশনা দিয়েছেন, যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করেছেন। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণে পাল্টে গেল বাংলাদেশের দৃশ্যপট। বাংলাদেশ পরিচালিত হতে লাগল ধানমণ্ডির ৩২ নম্বর থেকে। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে সেদিনের ভাষণ রেডিও, টেলিভিশনে প্রচার না করায় কোনো বাঙালি রেডিও, টেলিভিশনে যায়নি। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দাবির মুখে পাকিস্তান সরকার পরের দিন বঙ্গবন্ধুর ভাষণ রেডিও, টেলিভিশনে প্রচার করতে বাধ্য হয়। অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ হয়ে গেল কোট-কাছারি, আদালত-ফৌজদারি, অফিস, শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান।

এদেশের মুক্তি না হওয়া পর্যন্ত বন্ধ করে দেয়া হলো খাজনা, ট্যাক্স সবকিছুই। স্বৈরাচারী সরকারে বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের পাশাপাশি সশস্ত্র সংগ্রামের নির্দেশনা দিলেন এভাবে ‘প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল। তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে এবং জীবনের তরে রাস্তাঘাট যা যা আছে আমি যদিও হুকুম দিবার নাও পারি, তোমরা বন্ধ করে দেবে। …প্রত্যেক গ্রামে, প্রত্যেক মহল্লায় আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সংগ্রাম পরিষদ গড়ে তুলুন এবং আমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকুন। রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরও দেবো। এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাআল্লাহ। এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ এর কয়েকদিন আগে মতিঝিলের হোটেল পূর্বাণীতে আওয়ামী লীগ পার্লামেন্টারি বৈঠক শেষে ক্ষুব্ধ বঙ্গবন্ধু সাংবাদিকদের বলেছিলেন, আগামী ৭ মার্চ পর্যন্ত প্রত্যেকদিন সমগ্র পূর্ব বাংলায় দু’টো পর্যন্ত হরতাল অব্যাহত থাকবে। আর এর মধ্যে যদি ষড়যন্ত্রকারীরা বাস্তব অবস্থাকে স্বীকার করতে ব্যর্থ হয় তাহলে ৭ মার্চ আমি এক নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করব। সত্যি বঙ্গবন্ধু সেদিন সৃষ্টি করলেন এক অনন্য ইতিহাস। সেই ইতিহাসের হাত ধরেই জš§ নিল স্বাধীন, সার্বভৌম বাংলাদেশ, একটি জাতীয় পতাকা, একটি জাতীয় সংগীত।