হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালার মতো ড. মুহম্মদ জাফর ইকবালের বিদায়

চারদিকে শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারীর ভিড়। সবাই প্রিয় শিক্ষকের মুখের দিকে তাকিয়ে। চোখে চোখ রেখে ক্যাম্পাসের শেষ স্মৃতি ধরে রাখার চেষ্টা। সব মিলিয়ে এক আবেগঘন মুহূর্ত। এরই মাঝে পরম শ্রদ্ধা-ভালোবাসায় আবেগাপ্লুত গলায় অনেকেই বলে উঠলেন- স্যার, আমরা আপনাকে যেতে দিচ্ছি না। আপনি আমাদের সঙ্গেই থাকবেন। তখন চিরচেনা হাসির সঙ্গে প্রিয় শিক্ষক জাফর ইকবাল উত্তর দিলেন- ‘অফিসিয়ালি না হলেও, আন-অফিসিয়ালি আমি তো তোমাদের সঙ্গেই আছি। বিভাগের কোনো প্রয়োজন হলেই ছুটে আসব।’

প্রতিদিনের মতো গতকাল বুধবার সকাল ৯টার দিকে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবি) ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং (ইইই) বিভাগে যান অধ্যাপক ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল। তিনি এ বিভাগের প্রধান ছিলেন। এসেই বিদায়ী কাগজপত্র তৈরি ও দস্তখত করে নিজের কাজ শুরু করেন। এদিন ছিল তার ২৪ বছরের শিক্ষকতা জীবনের শেষ কর্মদিবস। শেষ কর্মদিবসেও অন্য দিনগুলোর মতো কর্মচঞ্চল ও উৎফুল্ল ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের এই অধ্যাপক।

বিদায়ী কাজকর্মের মাঝেই সিএসই বিভাগের শিক্ষার্থীদের একটি ক্লাস নেন জাফর ইকবাল। দুপুর ১২টার দিকে অংশ নেন বিভাগের একটি নিয়মিত সভায়। সেখানে তিনি তার সহকর্মীদের উদ্দেশে বলেন, তোমাদের যে কাজগুলো আছে, তোমরা তা ঠিকমতো পালন করবে।

এদিন বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারীরা প্রিয় শিক্ষকের সঙ্গে দেখা করতে বিভাগের সামনে ভিড় জমান। তিনি সবার সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলেন ও ছবি তোলেন। তার মুখ দেখে বোঝাই যাচ্ছিল না, গতকাল ছিল তার শেষ কর্মদিবস।

শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলার মাঝেই বিশ্ববিদ্যালয়ের এক কর্মকর্তার মুখে এলপিআর থেকে আরও এক বছরের বেতন পাবেন শুনে জাফর ইকবাল বলেন, ‘আমি তো কোনো কাজ করব না। আমার তো বেতন পাওয়ার কথা না! কীভাবে পাব!’ এ কথা শুনে আগত কর্মকর্তা তাকে জানান, সরকারি চাকরীজীবীদের অবসর প্রস্তুতির সময়কাল হিসেবে এক বছর বেতন পান। অন্য আরেক কর্মকর্তার কাছে বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনও ৫৯ দিন ছুটি পাওনা আছে শুনে তিনি আরও আশ্চর্য হয়ে বলেন, ‘আমি তো একাডেমিক ও নানা কাজে বাইরে অনেক সময় কাটাই। তারপরও ছুটি বাকি থাকে কীভাবে।’ এ সময় ওই কর্মকর্তা বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে যাওয়ার ক্ষেত্রে ছুটি নিয়ে গেলেও আপনার আরও ৫৯ দিন ছুটি পাওনা আছে।

বিদায়ী ব্যস্ততার মাঝে জাফর ইকবাল নির্মাণাধীন একটি ভাস্কর্য কমিটির সভাপতি হিসেবে সর্বশেষ তথ্য জানাতে শাবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. ফরিদ উদ্দিন আহমেদের সঙ্গে দেখা করেন। এ ছাড়াও বর্তমানে তার অধীনে গবেষণাকারী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলেন তিনি। এরপর সারাদিনের কর্মব্যস্ত দিন শেষে সহকর্মী ও শিক্ষার্থীদের নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় অডিটোরিয়ামে বিদায় উপলক্ষে আয়োজিত ‘রঙিন চশমা’ অনুষ্ঠানে যোগ দেন জনপ্রিয় এই কথাসাহিত্যিক।

শাবির সিএসই বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম সাইফ সমকালকে বলেন, ৭ অক্টোবর পর্যন্ত স্যার ঢাকা থাকবেন। এরপর তিনি এই সেমিস্টারে যে কোর্সগুলো নিচ্ছেন, সেগুলোর ক্লাস সম্পন্ন করবেন। তিনি আরও বলেন, সবাই চাই স্যার আমাদের সঙ্গে থাকুন। তিনি যেন আমাদের ছেড়ে চলে না যান।

সবার কাছে তিনি প্রিয় ‘জাফর স্যার’ বিদেশের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ ছেড়ে দেশের টানে ফিরে এসেছিলেন এক মেধাবী অধ্যাপক ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল। নিজের মেধা দিয়ে দেশকে এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যয়ে ১৯৯৪ সালের নভেম্বরে যোগ দিয়েছিলেন হাঁটি হাঁটি পা পা করে এগোনো এক বিশ্ববিদ্যালয়ে। আজ সেই শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় দেশের গণ্ডি পেরিয়ে সুনাম কুড়িয়েছে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে, যে সুনামের অনেক পালকই এসেছে ড. জাফর ইকবালের হাত ধরে। এ জন্যই সবার কাছে তিনি প্রিয় ‘জাফর স্যার’ হয়ে উঠেছেন। ২৪ বছরের বর্ণাঢ্য শিক্ষকতা জীবন শেষে প্রিয় এই মানুষ গড়ার কারিগর বিদায় নিলেন প্রিয় ক্যাম্পাস থেকে। গতকাল সন্ধ্যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মিলনায়তনে শিক্ষকতা জীবনের শেষ দিন উপলক্ষে বিদায় অনুষ্ঠান ‘রঙিন চশমা’ আয়োজন করে কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা।

কেন্দ্রীয় মিলনায়তনে অনুষ্ঠান নিয়ে তেমন কোনো সাজসজ্জা ছিল না। বিশাল মিলনায়তনে মঞ্চের পেছনে কালো ব্যাকড্রপ ওপর থেকে নিচে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। এর মাঝখানে ছোট একটি দু’রঙা ব্যানার। ব্যানারের পেছনে টিমটিমে কয়েকটি বাতি জ্বালিয়ে দেওয়া। ‘জাফর স্যার’ এখনও নিভে যাননি, কথাটি বোঝাতেই যেন জ্বলছিল এই আলো। সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে অনুষ্ঠান শুরু হয়। শুরুতে অধ্যাপক ড. জাফর ইকবাল এবং তার সহধর্মিণী অধ্যাপক ড. ইয়াসমিন হকের উদ্দেশ্যে বনলতা সেন কবিতাটি আবৃত্তি করা হয়। এ সময় প্রজেক্টরে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীর আঁকা জাফর ইকবালের একটি স্কেচ প্রদর্শন করা হয়। তারপর বিভাগের শিক্ষার্থীরা অনুষ্ঠানে রবীন্দ্রসঙ্গীত পরিবেশন করেন। মনোমুগ্ধকর সঙ্গীত পরিবেশন শেষে জাফর ইকবালকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করেন তার সাবেক ছাত্ররা, যারা এখন সিএসই বিভাগের শিক্ষক। এ সময় প্রাক্তন ছাত্রদের নিয়ে প্রজেক্টরে স্মৃতিচারণমূলক ছবি ও ভিডিওচিত্র প্রদর্শন ছাড়াও সিএসই বিভাগের বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী প্রিয় শিক্ষকের উদ্দেশে স্মৃতিচারণ করেন।

সিএসই বিভাগের সাবেক প্রধান, প্রথম ব্যাচের শিক্ষার্থী ও জাফর ইকবালের ছাত্র ড. অধ্যাপক মোহাম্মদ শহীদুর রহমান বলেন, এক ছাত্র বলেছিল, স্যার আমাদের স্বপ্ন দেখান। আর স্যার শাবির ওই সিএসই বিভাগে বসে স্বপ্ন দেখেছিলেন, এই বিভাগ বাংলাদেশের সবচেয়ে সেরা সিএসই বিভাগ হবে। আজ তা হয়েছে। স্যার সবসময় অনুপ্রেরণা দিয়ে গেছেন। এ ছাড়াও বক্তব্য রাখেন সিএসই বিভাগের প্রথম ব্যাচের শিক্ষার্থী ও বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. মো. রেজা সেলিম।

অধ্যাপক জাফর ইকবাল যখন বক্তব্য দেওয়ার জন্য মাইক্রোফোনটি হাতে নেন, কানায় কানায় পূর্ণ প্রায় ১২০০ জনের ধারণক্ষমতাসম্পন্ন শাবির কেন্দ্রীয় অডিটোরিয়ামে তখন পিনপতন নীরবতা। সবার প্রিয় স্যার বিদায়ের দিনে বক্তব্য রাখতে এসেছেন হালকা পেস্ট রঙের শার্ট আর কালো প্যান্ট পরে, সাদা হাতঘড়ি, বুকপকেটে একটি কলম। বরাবরের মতোই পরিচিত হাসি নিয়ে হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালার মতো বক্তব্য শুরু করেন। বক্তব্যের শুরুতে তিনি বলেন, আমি কিছুই দিতে পারিনি, আমার সবচেয়ে মজার কথা হলো, সবাই মিলে করেছে- ক্রেডিটটা হয়েছে আমার। তিনি বলেন, দু’বার আমার বাড়িতে আমাকে হত্যার জন্য হামলা করা হয়। মনে হয় আমি মুক্তিযুদ্ধের কথা বলি, মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে কথা বলি, এই জন্য। সরাসরি তো আর একটা মানুষকে হামলা করা যায় না। সেজন্য নাস্তিক বলে প্রথমে মানুষের মাঝে একটা ভ্রান্ত ধারণা প্রচার করা হয়। এরপর তিনি বলেন, তোমরা আমাকে যেভাবে বিদায় দিচ্ছ তাতে আমি তো ভাবছিলাম কালকে সকালে ক্লাসে আসব, তা বোধহয় আর হবে না। তার পরেও আমি বলছি, আমি এখনও আছি তোমাদের সঙ্গে, থাকব।

বক্তব্য শেষে অনুষ্ঠিত হয় জাফর ইকবালের সঙ্গে প্রশ্নোত্তর পর্ব। এ সময় এক শিক্ষার্থী প্রিয় শিক্ষকের তিনটি ইচ্ছা জানতে চাইলে তিনি বলেন, কোচিং-প্রাইভেটের জন্য শিশুদের শৈশব আনন্দময় থাকে না। তাই প্রথম ইচ্ছা কোচিং-প্রাইভেট বন্ধ করতে হবে। দ্বিতীয় ইচ্ছা- প্রত্যেক স্কুলে শিক্ষার্থীদের খেলার মাঠ যেন রাখা হয়। এ দুটি ছাড়া আরও তিনটি ইচ্ছার কথা জানালেও উত্তরে সেগুলো বলেননি তিনি।

প্রশ্নোত্তর পর্ব শেষে সিএসই অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে জাফর ইকবালকে ফুলের তোড়া দিয়ে শুভেচ্ছা জানানো হয়। পরে স্যারের ‘নতুন জীবন’-এর প্রতি শুভেচ্ছা জানিয়ে কেক কাটেন শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা।