শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসঃ কলঙ্ক মোছেনি এখনো

 

তরুণ ও প্রগতিশীল কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য লিখেছিলেন ‘সাবাস, বাংলাদেশ, এ পৃথিবী অবাক তাকিয়ে রয়-জ্বলেপুড়ে, মরে ছারখার, তবু মাথা নোয়াবার নয়। বাংলাদেশ নামক এই ব-দ্বীপের মানুষ বরাবরই স্বাধীনচেতা ও সাহসী। তাইতো বাঙালি বলতে জানে, ‘শত্রুর সাথে লড়াই করেছি, স্বপ্নের সাথে বাস; অস্ত্রেও শান দিয়েছি যেমন, শস্য করেছি চাষ।’

পাকিস্তানের দীর্ঘ সময়ের শোষণের অচলায়তনকে বাঙালি রুখে দাঁড়িয়েছিলো স্বাধীনতার স্বপ্ন নিয়ে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের তর্জনী হেলনীতে মুহূর্তেই ঐক্যবদ্ধ হয় গোটা জাতি। তাঁর দৃঢ়চেতা নেতৃত্বে মুক্তিকামী বাঙালি পৌঁছে যায় বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে।
ঠিক তখনই পাকিস্তানের বর্বর শাসকগোষ্ঠী তাদের এদেশীয় দোসরদের নিয়ে চালায় নির্মম এক হত্যাযজ্ঞ ।
পৃথিবীর ইতিহাসে ঘটে যায় আরেকটি নির্মম পরিকল্পিত গণহত্যা, একটি জাতিকে মেধাশূন্য করার নীলনকশার হয় বাস্তবায়ন। গোটা বাংলাদেশ যখন বিজয়ের সংবাদ পেতে উন্মুখ হয়ে আছে, ঠিক তখনই মরণছোবল দেয় পাক বাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসরেরা।
১৪ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে পাকিস্তান হানাদার বাহিনী ও রাজাকার, আল বদর, আল শামস বাহিনী মিলে হত্যা করে এদেশের সূর্যসন্তানদের।
পাকিস্তানের শাসকদের নির্দেশে আল-শামস, আল-বদর, রাজাকারদের মাধ্যমে বাঙালী বুদ্ধিজীবীদের তথা শিক্ষক, প্রকৌশলী, চিকিৎসক, আইনজীবী, লেখক, শিল্পী, বিজ্ঞানী, সাংবাদিকদের তালিকা প্রস্তুত করে পূর্বেই।

সেই তালিকা অনুযায়ী বাঙালী বুদ্ধিজীবীদের উপর চূড়ান্ত আঘাত আনা হয় ১৪ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে। পাকিস্তান সেনাবাহিনী বাংলাদেশের বিজয়ের মাত্র দু’দিন আগে ১৪ ডিসেম্বরে রাজাকার, আল বদর, আল শামস বাহিনীর পূর্ণ সহযোগিতায় অসংখ্য বুদ্ধিজীবীকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করে।
বিজয়ের পরে ঢাকার মিরপুর, নাখালপাড়া, রাজারবাগ, মোহাম্মদপুর চট্টগ্রামের পাহাড়তলী, লালখান বাজার, স্টেশন-কলোনী, গুডস হিলসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় হাত-পা-চোখ বাঁধা অবস্থায় বুদ্ধিজীবীদের বিকৃত মৃতদেহ পাওয়া যায়। মৃতদেহগুলোতে ছিল অকল্পনীয় নির্যাতনের চিহ্ন। অনেক বুদ্ধিজীবীর মৃতদেহ খুঁজেও পাওয়া যায়নি।
প্রত্যক্ষদর্শী ও শহীদদের স্বজনদের বর্ণনায় যে চিত্র উঠে আসে, তা মর্মস্পর্শী। বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে যিনি লেখক ছিলেন, তার হাতের সবগুলো আঙ্গুল কেটে নিয়ে হত্যা করা হয়েছে। চিকিৎসকের পাজর গুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। যিনি ক্রীড়াবিদ ছিলেন, তার পা কেটে হত্যা করা হয়েছে। এভাবেই অসংখ্য বুদ্ধিজীবীকে নারকীয় তাণ্ডবে হত্যা করে পাকি বাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসরেরা।
বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী পাকিস্তানী মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলি। বাংলাদেশের বিজয়ের পরে বঙ্গভবন থেকে রাও ফরমান আলীর একটি ডায়রী পাওয়া যায়; যাতে নিহত ও জীবিত বুদ্ধিজীবীদের তালিকা ছিল। এই ডায়রীতেই স্পষ্ট উল্লেখ আছে, জামায়াত ও ছাত্রসংঘ (বর্তমান ছাত্রশিবির) বাঙালী বুদ্ধিজীবীদের তালিকা তৈরী, হত্যার উদ্দেশ্যে ধরে আনা ও হত্যাকাণ্ডে পাকিস্তান সামরিক বাহিনীকে প্রত্যক্ষভাবে সহায়তা করে।

পাকিস্তানীরা কতটা অসভ্য-বর্বর জাতি এবং এদেশের পাকি-দালালরা কতটা নিমক-হারাম, তা ‘বুদ্ধিজীবী নিধন তদন্ত কমিশন’ কর্তৃক প্রকাশিত কিছু তথ্য দেখলে আরও স্পষ্ট হয়। ‘বুদ্ধিজীবী নিধন তদন্ত কমিশন’ তাদের রিপোর্টে বলছে, পাকিস্তানী মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী শুধু ডিসেম্বরে বিশ হাজার বাঙালী বুদ্ধিজীবীকে হত্যার পরিকল্পনা করেছিল। বুদ্ধিজীবীদের তালিকা প্রস্তুতের জন্য রাজাকার, আল বদর, আল শামসকে বিশেষ দায়িত্ব দেয়া হয়। এইসব বিশ্বাসঘাতক নরপশুদের নেতৃত্বে ছিল গোলাম আযম, মতিউর রহমান নিজামী, আলী আহসান মুজাহিদ, চৌধুরী মইনুদ্দিন, আশরাফুজ্জামান, কাদের মোল্লাসহ জামায়াত ও ছাত্রসংঘের তৎকালীন নেতারা।
গোলাম আযম ছিলেন সবকিছুর মূলহোতা। পাকিস্তান বাহিনীর সাথে বসে মাস্টারপ্ল্যান করতেন তিনি। নিজামী, মুজাহিদ ছিলেন তদারকি ও অপারেশনস পরিচালনার দায়িত্বে।

চট্টগ্রামে বুদ্ধিজীবীদের প্রধান হত্যাকারী ফজলুল কাদের চৌধুরী এবং তার দুই ছেলে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও গিয়াস কাদের চৌধুরী।
কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, সেইসব চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধী ও তাদের দল স্বাধীন বাংলাদেশে রাজনীতি করার সুযোগ পায়। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যেসকল চিহ্নিত রাজাকার-যুদ্ধাপরাধীদের বন্দী করে বিচারের আওতায় এনেছিলেন, জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় এসেই তাদের মুক্ত করেন। পাশাপাশি সহি সালামতে তাদের থাকার ব্যবস্থাও করে দেন। তাদেরকে অবাধে রাজনীতি করার সুযোগও করে দেন জিয়াউর রহমান।
কেবল তাই নয়, জিয়াউর রহমানের দল বিএনপি পরবর্তীতে শরীক দল হিসেবে বেছে নিয়েছিলো ’৭১ এর চিহ্নিত দেশবিরোধী শক্তি, রাজাকারদের আস্তানা জামায়াতকে।
২০০১ সালে জামায়াতের সঙ্গে জোট বাঁধে বিএনপি। জন্মের শুরু থেকেই দেশবিরোধী ও পাকিপ্রেমীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়া বিএনপি জামায়াতকে সঙ্গী করেই দেশব্যাপী প্রচারণা চালাতে থাকে। মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশে স্বাধীনতাবিরোধীদের জন্য বড় এক আঘাত। তবে এখানেই থেমে থাকেনি ‘স্বার্থের জন্য যেকোনো কিছু করতে প্রস্তুত বিএনপি’।
২০০১ সালে ক্ষমতায় এসে বিএনপি জামায়াতের মধ্যে থাকা চিহ্নিত রাজাকার ও যুদ্ধাপরাধীদের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদা দিয়ে ক্ষমতায় আসীন করা হয়েছিল। সে সুবাধে তারা বাংলাদেশের সর্বোচ্চ অর্জন জাতীয় পতাকার অপব্যবহারের সুযোগ পেয়েছিল। রাজাকারদের গাড়িতে তখন উড়েছিল জাতীয় পতাকা। সে লজ্জা কি মুছতে পারবে বাঙালী জাতি!
এবারের নির্বাচনেও বিএনপি চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীদের হাতে তুলে দিয়েছে তাদের দলীয় নির্বাচনী ধানের শীষ। শুধু তাই নয়, যুদ্ধাপরাধীদের সন্তানদের হাতেও তুলে দেয়া হয়েছে অভিশপ্ত এই প্রতীকটি। যে রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বে ১৯৭১ সালে এদেশে নির্মম হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিল সেই অভিশপ্ত জামায়াতের ২৫ প্রার্থীর হাতে বিএনপি তুলে দিয়েছে দলের নির্বাচনী মনোনয়নের টিকেট। যে রাজনৈতিক দল এদেশকে মেধাশূন্য করে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনায় লিপ্ত হয়েছিলো তাদের হাতেই ঐক্যফ্রন্ট তথা বিএনপি এদেশের নেতৃত্বের ভার তুলে দিতে চাচ্ছে।

জনমনে তাই প্রশ্ন উঠেছে, তবে কি বিএনপি পরবর্তী প্রজন্মের মাঝেও দেশবিরোধী বিদ্বেষ ছড়িয়ে দিতে তৎপর!
শত বাধা বিপত্তি সত্ত্বেও আজ শহীদ বুদ্ধিজীবীদের স্বপ্নের সোনার বাংলা বাস্তবে উপণীত। বেঁচে থাকলে স্বর্গের চেয়ে প্রিয় মাতৃভূমির এ সাফল্যে তারাই হয়তো সবচেয়ে বেশি খুশি হতেন। বাংলাদেশও কি তাদের অনুভব করছে না! এদেশকে যে আরও অনেককিছু দেয়ার ছিল মেধাবী সেই মানুষগুলোর।
বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ তাদের কাছে চিরঋণী। তোমাদের এই ঋণ কোনো দিন শোধ হবেনা।