করোনা ঝুঁকিতে করণীয় কী

 

আমরা সত্যিই এক কঠিন সময় অতিক্রম করছি। বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো করোনা বা কোভিড-১৯ ভাইরাসে আক্রান্ত তিনজন রোগী শনাক্ত করা হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর)। জানা যায়, আক্রান্তদের মধ্যে দুজন ইতালি ফেরত এবং একজন দেশে ছিলেন। তাদের মধ্যে দুজন পুরুষ ও একজন নারী। আক্রান্তদের বয়স ২৫ থেকে ৩৫ বছর। এদের মধ্যে দুজন একই পরিবারের। আক্রান্ত রোগীদের হাসপাতালে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। তারা বর্তমানে ভালো আছেন। তবে অন্য দেশের মতো বাংলাদেশে এখনও মাস্ক ব্যবহারকারী চোখে পড়ার মতো নয়।

বিশ্বব্যাপী ১০৩টি দেশ ও অঞ্চলে করোনা ভাইরাসের প্রকোপ ছড়িয়ে পড়েছে। করোনা ভাইরাসে এখন পর্যন্ত ১ লাখ ৬ হাজার ১৯৫ জন আক্রান্ত হয়েছে। প্রাণঘাতী এ ভাইরাসে মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৬০০ জনে। এছাড়া এ ভাইরাসে আক্রান্ত ৬০ হাজার ১৯০ জন চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে। শুধু চীনের মূল ভূখণ্ডেই করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা ৮০ হাজার ৬৯৬ এবং মৃত্যু হয়েছে ৩ হাজার ৯৭ জনের। চীনের পর করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি দক্ষিণ কোরিয়ায়। দেশটিতে এ ভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা ৭ হাজার ১৩৪ এবং মৃত্যু হয়েছে ৫০ জনের। চীনের বাইরে সবচেয়ে বেশি মৃত্যুর ঘটনা ইতালিতে। সেখানে আক্রান্তের সংখ্যা ৫ হাজার ৮৮৩ এবং মৃত্যু হয়েছে ২৩৩ জনের। ফ্রান্সে করোনা ভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা ১১২৬ জন, এরই মধ্যে মারা গেছেন ১৯ জন। অপরদিকে, ইরানে এখন পর্যন্ত ৫ হাজার ৮২৩ জন এ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে এবং মারা গেছে ১৪৫ জন।

ওদিকে পুরো চীন জুড়ে এখন করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে। আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। মৃতের সংখ্যা বাড়ছে দিন দিন। যেই শহর থেকে ভাইরাস উৎপত্তি- চীনের ওহান শহর। সেই শহরকে একেবারে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছে। বলা যায় একরকম বিচ্ছিন্ন শহর হয়ে গেছে ওহান। ওহান কিন্তু প্রদেশের একটা জনবসতিপূর্ণ এলাকা ছিল। সেখানে ১১ মিলিয়নের বেশি মানুষের বসবাস এবং এ শহরকে বলা হয় চীনের শিল্পের কেন্দ্রবিন্দু। কিন্তু কর্মব্যস্ত এ শহরের বর্তমান পরিস্থিতি যদি আপনি দেখেন তাহলে মনে হবে যেন এটা একটা ভূতুড়ে নগরী। রাস্তায় মানুষজন গাড়ি-ঘোড়া কিছু নেই। দেখে মনে হবে যেন জনবসতিহীন একটা এলাকা। অথচ এখনো এখানে মানুষ বসবাস করে। কিন্তু সবাই বাড়ি ঘরের মধ্যে বন্দি।

প্রয়োজন ছাড়া তাদের বাসা থেকে বের হওয়া নিষেধ। তবে হাসপাতালগুলোতে রয়েছে রোগীর ভিড়। এছাড়া এ শহরে ঢোকার সময় মনে হবে, যেন কোনো সীমান্তবর্তী এলাকায় ঢুকছেন। অনেক টাইট সিকিউরিটি। শহরে প্রবেশের সময় বলে দেওয়া হয় এ শহরে ঢুকলে নোটিস না আসা পর্যন্ত বের হওয়া যাবে না। বলা যায় একটা অভিশপ্ত নগরী হয়ে গেছে ওহান শহর। অথচ চীনে এই সময় প্রচুর ভিড় থাকে দোকানপাটগুলোতে কিন্তু এ শহরের দোকনপাট সব বন্ধ। সংক্রমণ ঠেকাতে ছুটির সংখ্যা দিন দিন বাড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। তবে মেডিকেল স্টাফরা দিনরাত কাজ করছে। এ ভাইরাস ঠেকাতে যে ধরনের জিনিস দরকার যেমন- মাস্ক, গ্লাভস এগুলো বানানোর কারখানাতে স্টাফরা ডাবল শিফট করে কাজ করছেন। কারণ অনেক জায়গাতেই মাস্কের সংকট দেখা দিয়েছিল। বেসরকারি অনেক প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন জায়গায় মাস্ক দান করে। ওহান শহরে আটকে পড়া মানুষদের মনের অবস্থা এখন কী? এটা তাদের চেয়ে বেশি বোঝা বা জানা সম্ভব না। বাঁচা মরার আশঙ্কায় তারা জীবনযাপন করছেন। কিন্তু তারা নিজেদের মনোবল টিকিয়ে রাখতে রাতের বেলা জানালা খুলে গান গায়। চিৎকার করে। ওহানকে অন্য শহর থেকে আলাদা করে দেওয়া হয়েছে। সেখানে বাস, ট্রেন, প্লেন, গণপরিবহন চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

তারপরও এ ভাইরাস দ্রুত ছড়াচ্ছে। অবশ্য চীন এজন্য কয়েক সপ্তাহের মধ্যে জরুরি সেবা দানের জন্য ১৩ শ’ শয্যাবিশিষ্ট হাসাপাতাল নির্মাণ করেছে। তবুও এভাবে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে যাওয়াকে বিশেষজ্ঞরা জরুরি হিসেবে দেখছেন। সবচেয়ে দুশ্চিন্তার বিষয় হচ্ছে, এ ভাইরাস এখন শুধু চীনেই সীমাবদ্ধ নয়। থাইল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, জাপান, মালয়েশিয়া, ভারত, সিঙ্গাপুর, ভিয়েতনাম কানাডা নেপালসহ বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। পরিসংখ্যানে প্রকাশ, জাপানে আক্রান্ত- ৬১৪, সিঙ্গাপুর- ৮১, হংকং- ৬২, থাইল্যান্ড- ৩৫, তাইওয়ান- ২২, মালয়েশিয়া- ২২, জার্মানি- ১৬, ভিয়েতনাম- ১৬, অস্ট্রেলিয়া- ১৫, যুক্তরাষ্ট্র- ১৫, ফ্রান্স- ১২, ম্যাকাও- ১০, সংযুক্ত আরব আমিরাত- ৯, যুক্তরাজ্য- ৯, কানাডা- ৮, ফিলিপাইন- ৩, ভারত- ৩, ইটালি- ৩, রাশিয়া- ২, স্পেন- ২, বেলজিয়াম- ১, কম্বোডিয়া- ১, মিশর- ১, ফিনল্যান্ড- ১, নেপাল- ১, শ্রীলঙ্কা- ১ এবং সুইডেন- ১ জন। আর বিশ^জুড়ে বিমানবন্দরগুলোতে করোনা ভাইরাস নিয়ে সতর্কতা জারি করা হয়েছে এবং থার্মাল ডিটেক্টর স্ক্যানারে টেস্ট করা হচ্ছে। বাংলাদশের এয়ারপোর্টেও থার্মাল ডিটেক্টর স্ক্যানার ব্যবহার করে দেহের তাপ মাপা হচ্ছে।

প্রশ্ন হচ্ছে, বাংলাদেশে বিপদ কতটা? বাংলাদেশ বিপদে পড়তে পারে যদি আমরা এখনই সচেতন না হই। যেসব দেশে ভাইরাস দেখা গেছে, সেসব দেশের ফেরত আসা মানুষ যদি ১৪ দিনের মধ্যে ঠাণ্ডা জ্বরে ভোগে তাহলে দ্রত সরকারি স্বাস্থ্য দফতরে জানানো উচিত। ভয়াবহ বিষয় হচ্ছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সর্বশেষ প্রতিবেদন। যাতে জানা যায়, যদি এখনই এ ভাইরাস প্রতিরোধ করার উপায় খুঁজে বের করে না আনা হয় তাহলে ৬ কোটি মানুষের প্রাণহানির আশঙ্কা রয়েছে। যদিও ইতোমধ্যে গবেষকরা ভাইরাসের জেনেটিক কোডিং নিয়ে কাজ শুরু করে দিয়েছেন। তবে ভ্যাকসিন বাজারে আসতে প্রায় এক বছরের মতো সময় লাগবে।

এখন পর্যন্ত এ ভাইরাসের কোনো চিকিৎসা নেই। কিন্তু সচেতনতা বাড়িয়ে কিছু কাজ করে এ ভাইরাস ছড়িয়ে পড়া রোধ করা সম্ভব। এ ভাইরাসের সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হচ্ছে সংক্রমিত মানুষের দেহে কোনো লক্ষণ দেখা দেওয়ার আগে করোনা ভাইরাস অন্যকে সংক্রমিত করতে পারে। এ ভাইরাসের লক্ষণগুলো প্রথমদিকে, কফ, ঠাণ্ডা, সর্দি, জ্বর এগুলো হতে থাকে। কিন্তু যখন এ ভাইরাস শরীরে জেঁকে ধরে তখন শরীর দুর্বল হয়ে যায়। শরীর প্রচণ্ড ব্যথা করে। শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। সঙ্গে ডায়রিয়াও দেখা দিতে পারে। এরপর নিউমোনিয়ার মতো কিছু লক্ষণ দেখা যায়। এ ভাইরাস বিশেষ করে বয়স্ক মানুষের জন্য প্রাণঘাতী হয়ে উঠেছে। ভ্যাকসিন বা ওষুধ না আসা পর্যন্ত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কিছু নিয়ম মানতে বলা হয়েছে। যেমন মাস্ক পড়ে চলাফেলা করা।

তবে মাস্ক পরে এ রোগে আক্রান্ত হওয়া থেকে নিরাপদ থাকা যাবে কিনা, এ নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা বিপরীত পরামর্শ দিচ্ছেন। তারা বলেন, যারা সুস্থ, মাস্ক তাদের ভাইরাস সংক্রমণের হাত থেকে বাঁচাতে পারবে না। উল্টো বারবার মাস্ক পরা ও খোলার ফলে সেটি ভাইরাসের আধার হিসেবে কাজ করতে পারে। এতে ভাইরাল জীবাণু মাস্কে আটকে আপনি নিজেকে নিজে সংক্রমিত করতে পারেন। মানুষ যা মনে করে, মাস্ক আসলে সে কাজ করে না। মুখের মাস্ক আশঙ্কা কমাতে পারে না। তবে যারা প্রকৃতপক্ষেই অসুস্থ, তাদের বাধ্যতামূলক মাস্ক পরা উচিত।

এতে তাদের মুখ বা নাক থেকে ভাইরাস বা জীবাণু ছড়ানোর পরিমাণ কমবে। আক্রান্তদের চিকিৎসা দিচ্ছেন, এমন স্বাস্থ্যকর্মীদের মাস্ক পরা দরকার। আতঙ্কিত হয়ে অতিরিক্ত মাস্ক কিনলে, যে ডাক্তার ও নার্সরা সামনের সারিতে দাঁড়িয়ে ভাইরাসের সঙ্গে যুদ্ধ করছেন, তাদের জন্য মাস্কের সরবরাহ কমে যেতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু মাস্ক পড়লেই হবে না। সেই সঙ্গে কিছু নিয়মও মানতে হবে। যেমন, রেগুলার মাস্ক পরিবর্তন করতে হবে। কমিউনিটি সেন্টারসহ সকল লোক সমাগমের স্থান এড়িয়ে চলতে হবে। গণপরিবহন সম্ভব হলে পরিহার করতে হবে। পাবলিক বাসে হুড়াহুড়ি করে উঠবেন না। গা ঘেষাঘেষি করে দাঁড়াবেন না। বাংলাদেশে করমর্দন করা, বুক মেলানো, কোলাকুলি করা এসব অভ্যর্থনার প্রচলিত সংস্কৃতি। করোনা পরিস্থিতির কারণে এসব বিষয়ে আপাতত নতুন সতর্কতার কথা ভাবতে হবে। কারো সঙ্গেই হ্যান্ডশেক করা যাবে না। মুখে সালাম, আর চোখে চোখে আই শেক করে কুশল বিনিময় করতে হবে। ডিম, মাছ, মাংস খুব ভালোভাবে রান্না করে খেতে হবে। হ্যান্ডওয়াশ ও গরম পানি দিয়ে বেশি বেশি হাত ধুতে হবে। প্রচুর পানি খেতে হবে। বাইরে থাকলে চোখ ও নাক স্পর্শ করা থেকে বিরত থাকতে হবে। হাঁচি কাশি দেওয়ার সময় রুমাল অথবা টিস্যু পেপার দিয়ে মুখ ঢাকতে হবে। জীব-জানোয়ারের কাছে যাওয়ার সময় মাস্ক ও হাতের গ্লাভস পরে নিতে হবে। অপ্রয়োজনে ঘরের দরজা-জানালা খোলা রাখা উচিত নয়।

করোনা নিয়ে অত ভয়-আতঙ্কের কিছু নেই। এক সময় ঝড় সাইক্লোন বন্যায় বাংলাদেশে অনেক লোকজন মারা যেত। কিন্তু এখন এসব পরিস্থিতির সঙ্গে লড়তে লড়তে অভ্যস্ত সংগ্রামী বাঙালির মৃত্যু কমেছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগে এখন কোনো কোনো ক্ষেত্রে বাংলাদেশের চাইতে আমেরিকায় মৃত্যুহার বেশি। করোনা ভাইরাস সংক্রমণ প্রতিরোধেও আশা করি বাংলাদেশ নতুন দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করবে। কারণ, আশা করা যায় এ ভাইরাস দ্রতই নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে। আতঙ্কিত না হয়ে, মরার আগেই না মরে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকুন। হাঁচি-কাশি হলে যেন টিস্যু ব্যবহার করা হয় সে অভ্যাস করুন। নিজের অথবা পরিবারের কারো করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার লক্ষণ দেখা দিলে ইনস্টিটিউট অব এপিডেমোলোজি ডিজিজ কন্ট্রোল এন্ড রিসার্চে (আইইডিসিআর) যোগাযোগ করতে এ নম্বরগুলো হাতের কাছে রাখুন- ০১৯৩৭০০০০১১, ০১৯৩৭১১০০১১, ০১৯২৭৭১১৭৮৪, ০১৯২৭৭১১৭৮৫।

শেখ আনোয়ার : বিজ্ঞান লেখক ও গবেষক
xposure7@gmail.com