১৫ই আগস্টের মূল ষড়যন্ত্রকারীদের একজন জিয়া

 

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকাণ্ডের সাথে শুধু খন্দকার মোশতাক ও কয়েকজন সেনা অফিসারই জড়িত ছিলেন না বরং বিদেশী অনেক ষড়যন্ত্রের ফলাফলই ছিলো ১৫ আগস্টের সে নৃশংস হত্যাযজ্ঞ, এমনটাই প্রতিফলিত হয়েছে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ আয়োজিত ওয়েবিনারে আলোচকদের বক্তব্যে। পাকিতান, লিবিয়া, যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশও জড়িত ছিলো বলে জানিয়েছেন বক্তারা। ১৯ আগস্ট রাত ৮.৩০ মিনিটে প্রচারিত এই ওয়েবিনারের বিষয়বস্তু ছিলো ‘৭৫-পরবর্তী বাংলাদেশঃ বঙ্গবন্ধুর খুনিদের পুনর্বাসন’।

সুভাষ সিংহ রায় বলেন, ৯ এপ্রিল ১৯৭৯ সালে পার্লামেন্টে জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের বিচারের পথ বন্ধ করতে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশকে আইনে পরিণত করেছিল। এরপরে ১৯৯৬ সালে জনগণের সরকার আওয়ামী লীগ যখন ক্ষমতায় আসে তখন সংসদে এই আইন নিয়ে সরকারের আইনমন্ত্রী ইনডেমিটি আইন বিলটি পেশ করেছিলো তখন বি এন পি সংসদে ওয়াক আউট করেছিলো।’ তিনি বলেন, ‘ইনডেমনিটি দেওয়ার যে বজ্জাত অভ্যাস এটা বিএনপির জন্মলগ্ন থেকেই।’

সুভাষ সিংহ রায় বলেন, ‘আমার বলতে কষ্ট হয় জিয়াউর রহমান তার সাঙ্গপাঙ্গ দিয়ে ১৫ আগস্ট কে নাজাত দিবস পালন করতে উৎসাহ দিত। এমন কি তার স্ত্রী বেগম জিয়ার ভুয়া জন্মদিন ১৫ আগস্ট পালনের নামে যা চলছে তা নেক্কারজনক।’

মোহাম্মদ শাহরিয়ার আলম বলেন, আমি ব্যক্তিগতভাবে নিজেকে কখনো সফল পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দাবী করতে পারবো না যতদিন পর্যন্ত জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর শেষ খুনিকে আইনের আওতায় আনতে না পারবো। এটা যে কত বড় গ্লানি জাতি হিসেবে, তার চেয়ে বড় গ্লানি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের।

সৈয়দ বদরুল আহসান বলেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট সরকার ১৫ আগস্টের ঘটনাটি জানতো অনেকে মনে করেন। তখন এম্বাসিতে ফিলিপ চেরীর সাথে খুনি চক্র কয়েকবার দেখা করেছেন। ফারুক রহমান গাদ্দাফির সাথে দেখা করেছিলো। ১৯৭৩ সালেই তাঁর পরিকল্পনা ছিল একটা কিছু ঘটাবে। তারা লিবিয়ায় গিয়ে আশ্রয় নিয়েছে। লিবিয়ার কানেকশন টা বজায় রেখেছে।

গাদ্দাফির সাথে বঙ্গবন্ধুর কথোপকথনের সূত্র উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘গাদ্দাফি শেখ মুজিবকে বলেছিলো তোমরা ইসলামি রাষ্ট্র করো না কেন? বঙ্গবন্ধু উত্তর দিয়েছিলেন আমরা বাঙালি মানুষ, আমরা ধর্ম নিরপেক্ষ রাষ্ট্র, এটা আমরা করবো না।

বদরুল আহসান বলেন, জুলফিকার আলী ভুট্টো কিন্তু ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সকালে তাঁর অফিসে লোকজনকে জিজ্ঞাস করলো ঢাকা থেকে কোন খবর আছে কিনা? তাঁর মানে সে আগে থেকে জানতো এমন কিছু। এরপরে তারা পাকিস্তান রেডিওতে খবরটি প্রচার করলো, বিশ্ববাসী জানলো সেই ক্যু এর কথা।

হাসান মোর্শেদ বলেন, ১৯৭৫ এর ১৫ আগস্ট থেকে নভেম্বর ৩ তারিখ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর খুনী সামরিক অফিসাররা সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী ছিলো। বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের ১ সপ্তাহের মধ্যে জিয়াউর রহমান কে সেনাবাহিনীর প্রধান করে সামরিক গোষ্ঠী। বঙ্গবন্ধুর খুনীরা দেশ থেকে চলে যেতে চায় যুক্তরাষ্ট্রে কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র তাদের আশ্রয় না দিলে তারা ব্যাংকক হয়ে লিবিয়া চলে যায়।

তিনি বলেন, ‘১৯৮৭ সালের আগস্টের ৩ তারিখ ফ্রিডম পার্টি নামের একটি রাজনৈতিক দলের ঘোষনা দেন বঙ্গবন্ধুর খুনীরা, এই দলের প্রধান হলেন বঙ্গবন্ধু খুনী কর্নেল সৈয়দ ফারুক, সাথে বজলুল হুদা, রশিদ এরা ছিলো। এরশাদ এই খুনীদের দেশে ফিরিয়ে নিয়ে এসে দল গঠনের সুযোগ দেন।’

তিনি আরো বলেন, এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে যখন আওয়ামী লীগ ফ্রন্ট লাইন থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছে তখন আওয়ামী লীগ কে সামলাতে একটা পেটোয়া বাহিনী হিসেবে ফ্রিডম পার্টি করতে জায়গা ছেড়ে দেন সে সময়ের সেনাশাসক জেনারেল এরশাদ।

বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুলের একটি বক্তব্যের জবাবে শামস রহমান বলেন, ১৯৭৫ পরবর্তী সময় থেকে ইতিহাস যেভাবে বিকৃত হয়ে আসছে এবং যারা এই বিকৃতির সাথে জড়িত তাদের মুখ থেকে এই ধরনের কথা শোনাটা সমীচীন নয় বলে আমি মনে করি। আমার মনে হয় তিনি কোন রকম তথ্য উপাত্ত্ব জানেন না বা জানার চেষ্টা করেন না বলেই তিনি বঙ্গবন্ধুর হত্যায় জিয়া জড়িতকে এড়িয়ে গেছেন।

তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা একটা নীল নকশার অংশ। এই নীল নকশায় জেনারেল জিয়া যেমন জড়িত ছিলেন ঠিক তেমনই মোস্তাক জড়িত ছিলো, ছিলো উচ্চাকাঙ্খী কিছু সামরিক কর্মকর্তা। ইতোমধ্যে প্রকাশিত বিভিন্ন তথ্য অনুযায়ী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের সাথে জড়িত ছিলো।

তিনি আরো বলেন, সাংবাদিক ও গবেষক লরেন্স লিফশ্যুলৎজ তার একটি সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, বঙ্গবন্ধুকে কিসিঞ্জার ঘৃণা করতেন এবং মুজিবকে হত্যার জন্য ষড়যন্ত্রে তিনিও যুক্ত ছিলেন। বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডে যে যার মত ভূমিকা পালন করে গেছে বলেই তাকে হত্যা করা সহজ হয়ে গেছে। আর বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডে জিয়া জড়িত ছিলো সেটা বোঝার জন্য ধারাবাহিক ভাবে গবেষণা করলেই কথাটার সত্যতা প্রমান হবে বলেও তিনি মত প্রকাশ করেন।

সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড ইনফরমেশনের সহযোগিতায় এবং প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী ব্যারিস্টার শাহ আলী ফরহাদের সঞ্চালনায় আয়োজিত এই ওয়েবিনারের এই পর্বের অতিথি ছিলেন মাননীয় পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মাদ শাহরিয়ার আলম এমপি, গবেষক ও কলামিস্ট সৈয়দ বদরুল আহসান, কলামিস্ট ও সাবেক ছাত্রনেতা সুভাষ সিংহ রায়, অস্ট্রেলীয় বিশ্ববিদ্যালয় RMIT’র শিক্ষক প্রফেসর শামস রহমান এবং লেখক ও গবেষক হাসান মোরশেদ।

দলের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজ ও ইউটিউব ছাড়াও অনুষ্ঠানটি সরাসরি প্রচারিত হয় বিজয় টিভি, বিডি নিউজ২৪, বাংলা নিউজ২৪, বার্তা২৪, ইত্তেফাক, সমকাল, যুগান্তর, সারাবাংলা, ভোরের কাগজ, জাগো নিউজ২৪ ও বাংলাদেশ জার্নালের ফেসবুক পাতায়।