বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তালিকায় বাংলাদেশের গ্লোবের টিকা

দেশি ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান গ্লোব ফার্মাসিউটিক্যালস গ্রুপ অব কোম্পানিজ লিমিটেডের সহযোগী প্রতিষ্ঠান গ্লোব বায়োটেক লিমিটেডের আবিষ্কৃত বৈশ্বিক মহামারী কোভিড-১৯-এর টিকা প্রি-ক্লিনিক্যাল টেস্টের জন্য তালিকাভুক্ত করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। গতকাল শনিবার গ্লোব বায়োটেক এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। ডব্লিউএইচওর ওয়েবসাইটেও তালিকাটি প্রকাশ করা হয়। জানতে চাইলে টিকা আবিষ্কারক দলের প্রধান গবেষক ও গ্লোব বায়োটিক লিমিটেডের সিইও ড. কাকন নাগ আমাদের সময়কে বলেন, ‘বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা গ্লোব বায়োটেকের আবিষ্কৃত ব্যানকভিড ভ্যাকসিনের তিনটি ক্যান্ডিডেট তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে।

ভ্যাকসিন ক্যান্ডিডেট তিনটি হচ্ছে, D614G variant mFNA Vaccine, DNA Plasmid Vaccine, Adonocirus Typo-5 Vcctor Vcaccine. বাংলাদেশের গ্লোব বায়োটেক-ই বিশ্বের একমাত্র প্রতিষ্ঠান, যাদের সর্বোচ্চ তিনটি ভ্যাকসিনের নাম তালিকায় রয়েছে। এটা বাংলাদেশের জন্য একটি গর্বের বিষয়। আমরা সবাই আজ আনন্দিত।

গতকাল শনিবার গ্লোব বায়োটেক লিমিটের পক্ষ থেকে দেওয়া এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানান হয়, আমরা অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে, ডব্লিউএইচও গত ১৫ অক্টোবর গ্লোব বায়োটেক লিমিটেডের আবিষ্কৃত উল্লিখিত তিনটি ভ্যাকসিন কোভিড-১৯-এর ভ্যাকসিন ক্যান্ডিডেট তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে।

গত ২ জুলাই সংবাদ সম্মেলনে কোভিড-১৯-এর ভ্যাকসিন তৈরির ঘোষণা দেয় গ্লোব বায়োটেক। ওই সংবাদ সম্মেলনে তারা জানান, প্রাণীর ওপরে ভ্যাকসিনটির ট্রায়াল শেষ করতে ছয় থেকে আট সপ্তাহ লাগবে। এর পর প্রাণিদেহে ভ্যাকসিনটি সফল প্রমাণিত হলেই তারা মানবদেহে ট্রায়াল পরিচালনার অনুমতির জন্য আবেদন করবেন।

গত বুধবার গ্লোব বায়োটেক লিমিটেডের আবিষ্কৃত টিকা ‘ব্যানকোভিড’-এর ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল পরিচালনা করতে কন্ট্রাক্ট রিসার্স অর্গানাইজেশন (সিআরও) আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণাকেন্দ্র ‘আইসিডিডিআরবি’র সঙ্গে আনুষ্ঠানিক চুক্তি করেছে। এ প্রসঙ্গে গবেষক দলের প্রধান ড. কাকন নাগ বলেন, আইসিডিডিআরবি ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছে।

আইসিডিডিআরবির ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক ড. তাহমিদ আলম বলেন, প্রাণিদেহে যে পরীক্ষাগুলো হয়েছে তার রেজাল্টের পর আমরা দুপক্ষ দেখব এবং পর্যালোচনা করব। তারপর ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে যে প্রটোকল হবে, সেগুলো দেখব এবং রিভিউ করব। এর পর অনুমোদনের জন্য আবেদন করা হবে।

গ্লোব বায়োটেকের চেয়ারম্যান হারুনুর রশিদ বলেন, বিশ্বে ৬টি প্রতিষ্ঠান বিশেষভাবে কাজ করছে কোভিড ভ্যাকসিন নিয়ে। তার মধ্যে আইসিডিডিআরবিও রয়েছে। আমরা তাদের সঙ্গে নিয়েই হিউম্যান ট্রায়ালে যাচ্ছি। গত ৫ অক্টোবর গ্লোব বায়োটেক এক সংবাদ সম্মেলনে জানায়, তাদের উদ্ভাবিত টিকা ব্যানকোভিড খরগোশ ও ইঁদুরের শরীরে প্রয়োগ করে ভালো সাফল্য পাওয়া গেছে।

গবেষক দলের অন্যতম সদস্য ড. মহিউদ্দিন আমাদের সময়কে বলেন, গ্লোব বায়োটেক লিমিটেড আবিষ্কৃত টিকা ব্যানকোভিডের প্রি-ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল এনিম্যাল মডেলে সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। এখন হিউম্যান মডেলে টিকার সুরক্ষা ও কার্যকারিতা পরীক্ষায় একটি পূর্ণাঙ্গ ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। এ ট্রায়াল পরিচালনার জন্য আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত কন্ট্রাক্ট রিসার্স অর্গানাইজেশন আইসিডিডিআরবি সঙ্গে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হয়েছে।

 

এখন থেকে বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যান্ড রিসার্চ কাউন্সিলের (বিএমআরসি) ও ওষুধ প্রশাসনের কাছে আবেদন করা থেকে আমাদের হয়ে আইসিডিডিআরবি কাজ করবে।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যান্ড রিসার্চ কাউন্সিলের (বিএমআরসি) পরিচালক ডা. মাহমুদ উজ জাহান গণমাধ্যমকে জানান, আবেদন পাওয়ার পরই তিনি এ বিষয়ে মন্তব্য করতে পারবেন।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) ফারমাকোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. সায়েদুর রহমান গণমাধ্যমে বলেন, গ্লোব বায়োটেককে বিএমআরসির কাছে আবেদন করতে হবে। ন্যাশনাল রিসার্চ এথিকস কমিটি প্রি-ক্লিনিক্যাল পরীক্ষার ফলগুলো বিশ্লেষণ এবং একে মানবদেহে পরীক্ষার অনুমতি দেবে কি না, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে।

স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের মতে, ক্লিনিক্যাল বা হিউম্যান মডেলিং ট্রায়াল তিনটি পর্যায়ে করা হয়। প্রথম পর্যায়ে, ভ্যাকসিনটি নিরাপদ কি না, তা যাচাই করতে একটি ক্ষুদ্র গ্রুপে কয়েকজনের দেহে প্রয়োগ করা হয়। সুরক্ষা ও কার্যকারিতা আরও মূল্যায়নের জন্য দ্বিতীয় ধাপের পরীক্ষায় একটি বড় গ্রুপে বেশ কয়েকজন মানুষের দেহে প্রয়োগ করা হয়। ভ্যাকসিনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া যাচাই ও ডোজের পরিমাণ নির্ধারণ করে কয়েক হাজার মানুষের দেহে ভ্যাকসিন প্রয়োগ করে তৃতীয় পর্যায়ের ট্রায়াল পরিচালনা করা হয়। আসিফ মাহমুদ জানান, অনেক মানুষই ট্রায়ালে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে অংশ নিতে তাদের সংস্থায় ফরম পূরণ করছেন। আন্তর্জাতিক প্রটোকল অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার পরই মানবদেহে পরীক্ষা শুরু হবে।’

সিআরও প্রতিষ্ঠান হিসেবে ‘আইসিডিডিআরবি’র সঙ্গে আনুষ্ঠানিক চুক্তির কয়েকদিন আগে গ্লোব বায়োটেক লিমিটেডের আবিষ্কৃত টিকা প্রি-ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের ফল আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্ম, নরড়ৎীরাব.ড়ৎম— বায়ো আর্কাইভে প্রকাশিত হয়েছে। বায়ো আর্কাইভকে বলা হয় ‘প্রি-প্রিন্ট সার্ভার’। জীববিজ্ঞান বা চিকিৎসা সংক্রান্ত যে কোনো গবেষণার ফল দ্রুত তুলে ধরতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিজ্ঞানীরা ‘প্রি-প্রিন্ট সার্ভার’ ব্যবহার করে থাকেন।

গত ৫ অক্টোবর এক সংবাদ সম্মেলনে গবেষক দলের প্রধান ড. কাকন নাগ বলেন, গ্লোব বায়োটেক সজঘঅ প্রযুক্ত ব্যবহার করে সজঘঅ-খঘচ- তে রূপান্তর করে ভ্যাকসিন তৈরি করেছে। এনিমেল ট্রায়ালে প্রমাণ হয়েছে এ

ভ্যাকসিন শরীরে কোনো বিষক্রিয়া সৃষ্টি করে না। এমনকি রক্তেও কোনো প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে না। গ্লোব আবিষ্কৃত ব্যানকোভিড যুক্তরাষ্ট্রের মর্ডানা আবিষ্কৃত ভ্যাকসিনের সমপর্যায়ের বলে দাবি করে তিনি বলেন এটি প্রয়োগে স্বল্প সময়ে প্রাণিদেহে অ্যান্টিবডি তৈরির প্রমাণ মিলেছে।

গ্লোব বায়োটেকের চেয়ারম্যান হারুনুর রশিদ বলেন, আমাদের এ টিকা ফেক নয়। আমরা আশা করি সরকার আমাদের পাশে থাকবে, সর্বক্ষেত্রে সহযোগিতা করবে। অবশ্যই সহযোগিতা করবে। সবাই মিলে যদি চেষ্টা করতে পারি ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে সারা বাংলাদেশে ভ্যাকসিন দেওয়া শুরু করতে পারব।

করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে বিশ্বজুড়ে গবেষকরা একটি ভ্যাকসিন তৈরির লক্ষ্যে ছুটছেন। এর মধ্যে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ১৪০টির বেশি ভ্যাকসিনের ওপর নজর রাখছে। ভ্যাকসিন তৈরি ও পরীক্ষা সময়সাপেক্ষও। বেশ কয়েকটি ধাপ পেরিয়ে তবেই ভ্যাকসিন ব্যবহারের উপযোগী হয়।