ধীরে হলেও ঘুরে দাঁড়াচ্ছে অভিবাসন খাত

প্রায় সাত মাস বন্ধ থাকার পর চলতি মাসে কর্মী যেতে শুরু করেছে বিদেশে। এ মাসের প্রথম ১৫ দিনে কর্মী গেছে প্রায় পাঁচ হাজার। করোনাকালের আগের তুলনায় সংখ্যাটি সামান্য হলেও একে অভিবাসন খাতের ঘুরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে। করোনাকালে প্রবাসীরা রেকর্ড পরিমাণ রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন। নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে কৃষি ও স্বাস্থ্য খাতে। তবে দক্ষ কর্মীর অভাবে বাংলাদেশ এ সম্ভাবনা কতটা কাজে লাগাতে পারবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

করোনা মহামারিতে লণ্ডভণ্ড হয় অভিবাসন খাত। গত সোমবার পর্যন্ত সোয়া তিন লাখের বেশি কর্মী চাকরি হারিয়ে বিদেশ থেকে ফেরত এসেছেন। আড়াই লাখের বেশি প্রবাসী কর্মী দেশে আটকা পড়েছিলেন ছুটিতে এসে। সোয়া লাখ নতুন কর্মী ভিসা পেয়েও বিদেশ যেতে পারেননি লকডাউনের কারণে। সব মিলিয়ে অন্তত সাত লাখ মানুষ ঘোর সংকটে পড়েছিলেন।

ফেরত আসা কর্মীদের গতি না হলেও আটকেপড়াদের বড় অংশ কর্মস্থলে ফিরে গেছেন। নতুন কর্মী সংখ্যায় অল্প হলেও যেতে পারছেন। নতুন করে কর্মীর চাহিদাপত্র আসছে বিভিন্ন দেশ থেকে। গত দুই মাসে ১৫ হাজারের বেশি নতুন ও আগে ভিসা পাওয়া কর্মী বিদেশ গিয়েছেন। শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, ইউরোপের দেশগুলো থেকেও চাহিদাপত্র এসেছে। এমন পরিস্থিতিতে আজ শুক্রবার পালিত হচ্ছে ‘আন্তর্জাতিক অভিবাসী দিবস’। এবার এ দিবসের প্রতিপাদ্য ‘মুজিববর্ষের আহ্বান, দক্ষ হয়ে বিদেশ যান’। এ উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ বাণী দিয়েছেন। গতকাল এক বাণীতে রাষ্ট্রপতি বলেন, অভিবাসী কর্মীরা দেশে-বিদেশে কোথাও কোনোভাবে যেন হয়রানির শিকার না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে বসবাসরত বাংলাদেশি অভিবাসীদের শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়ে রাষ্ট্রপতি বলেন, তারা আমাদের দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। একই সঙ্গে পরিবার-পরিজনের জীবন নির্বাহ এবং তাদের পারিবারিক ও সামাজিক জীবনমান উন্নয়নেও বিশেষ অবদান রাখছেন। তাদের পাঠানো রেমিট্যান্স জাতীয় অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতিতে তারাও গর্বিত অংশীদার।

এদিকে, গত ৪৪ বছরে বিদেশ যাওয়া বাংলাদেশিদের ৪৭ শতাংশই অদক্ষ আর ১৫ শতাংশ আধাদক্ষ। যাদের আধাদক্ষ বলা হচ্ছে, তাদের দক্ষতাও সার্টিফিকেটসর্বস্ব। করোনাকালে চাকরি হারিয়ে যারা ফিরে এসেছেন, তাদের অধিকাংশই অদক্ষ। তবে দক্ষরা এই প্রতিকূল অবস্থায়ও টিকে আছেন। তাদের ঘামে-শ্রমে অর্জিত রেমিট্যান্সে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ রেকর্ড ৪২ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। এ বছর ১০ ডিসেম্বর পর্যন্ত পৌনে দুই লাখ কোটি টাকার সমপরিমাণ রেকর্ড সাড়ে ২০ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে।

রিক্রুটিং এজেন্সি ফাতেমা এমপ্লয়মেন্ট সার্ভিসের মালিক জাহিদুল ইসলাম জানান, গত মার্চে তার এজেন্সি ৮৫ জন কর্মীর ভিসা, স্বাস্থ্য পরীক্ষাসহ সব প্রক্রিয়া শেষ করলেও লকডাউনের কারণে বিদেশ পাঠাতে পারেনি। সংকটাপন্ন হয়ে অফিস বন্ধ করে দিতে বাধ্য হন তারা। তবে নভেম্বর থেকে ধীরে ধীরে পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে। ভিসা পেয়েও আটকেপড়া ৮৫ কর্মীর পাঁচজনকে পাঠাতে পেরেছেন। স্বাস্থ্য পরীক্ষায় অনুত্তীর্ণ সাতজন ছাড়া বাকিরা মাসখানেকের মধ্যে যেতে পারবেন। নতুন করে ইলেকট্রনিক ভিসা (ওকালা) নিতে না হওয়ায় বাড়তি টাকা লাগছে না তাদের। ডিসেম্বরে সৌদি আরব থেকে ১৫ জন নতুন কর্মী পাঠানোর চাহিদাপত্র পেয়েছেন। এ সংখ্যা করোনার আগের ১০ ভাগের এক ভাগ মাত্র।

চলতি মাসে প্রায় প্রতিদিনই বিদেশে কর্মী পাঠানোর অনুমতিপত্র দিচ্ছে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়। মঙ্গলবার রিক্রুটিং এজেন্সি হোমল্যান্ড ট্রেডিং, তার আগের দিন ওরিয়েন্ট কর্মী পাঠানোর অনুমতি পেয়েছে। রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর সংগঠন বায়রার মহাসচিব শামীম আহমেদ চৌধুরী বলেছেন, গত মাসে তার প্রতিষ্ঠান থেকে ১৯ জন নতুন কর্মী দুবাই গিয়েছেন। বাংলাদেশে করোনা পরিস্থিতি যত দ্রুত উন্নতি হবে, তত তাড়াতাড়ি কর্মী পাঠানোর সংখ্যা বাড়বে।

বায়রা মহাসচিব বলেছেন, করোনা অভিবাসন খাতকে লণ্ডভণ্ড করলেও নতুন সম্ভাবনাও সৃষ্টি করেছে। মহামারি সারা দুনিয়াকে কৃষি ও স্বাস্থ্য খাতের গুরুত্ব বুঝিয়েছে। উন্নত দেশগুলোতে আগামী দিনে এ দুই খাতে প্রচুর কর্মীর প্রয়োজন হবে। প্রচুর সেবা প্রদানকারীও (কেয়ার গিভার) লাগবে। এসব খাতে প্রশিক্ষিত কর্মী তৈরি করতে হবে। দক্ষ কর্মী তৈরি করতে না পারলে করোনা-পরবর্তীকালে টিকে থাকা যাবে না। বিদেশে যাওয়ার খরচ অবশ্যই কমাতে হবে। শুধু একদিন ‘অভিবাসী দিবস’ পালন নয়, সারাবছর এসব কাজ করতে হবে অভিবাসন খাতকে ঠিক করতে।

জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্যানুযায়ী, ২০১৬ সাল থেকে বছরে সাত লাখের বেশি কর্মী বিদেশ গিয়েছেন। ২০১৭ সালে রেকর্ড ১০ লাখ আট হাজার ৫২৫ জন কর্মী গিয়েছেন। চার বছরে ৩২ লাখ বাংলাদেশি বিদেশে চাকরি করতে গেছেন। চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে এক লাখ ৮১ হাজার ২১৮ কর্মী বিদেশ গিয়েছেন। ব্র্যাকের অভিবাসন কর্মসূচির প্রধান শরিফুল হাসান বলেছেন, গড়ে মাসে ৬০ হাজার কর্মী বিদেশ যান। গত ৯ মাসে পাঁচ থেকে সাড়ে পাঁচ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টির সম্ভাবনা নষ্ট হয়েছে করোনায়।

আটকেপড়া কর্মীদের মধ্যে প্রায় ৮০ হাজার সৌদি আরব থেকে ছুটিতে দেশে এসেছিলেন। গত সেপ্টেম্বর মাসজুড়ে কর্মস্থলে ফেরার জন্য বিমানের টিকিটের দাবিতে তাদের আন্দোলন ও ভোগান্তি ছিল সংবাদমাধ্যমের নিয়মিত খবর। আটকেপড়া সৌদিপ্রবাসীদের অন্তত ৮০ শতাংশ কর্মস্থলে ফিরতে পেরেছেন বলে জানিয়েছেন শরিফুল হাসান।

ব্র্যাকের অভিবাসন কর্মসূচির প্রধান বলেছেন, করোনা খাদ্য নিরাপত্তার গুরুত্ব নতুন করে বুঝিয়েছে। ইউরোপ, আমেরিকাসহ উন্নত বিশ্বে কৃষিকাজে কর্মী লাগবে। বাংলাদেশে কৃষির অভিজ্ঞ জনবল রয়েছে। অতীতে দেখা গেছে, এজেন্সিগুলো কৃষি না জানা লোকজনকে এ কাজে পাঠিয়েছে। এতে শ্রমবাজার নষ্ট হয়েছে। দেশজুড়ে কৃষি অফিস ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। সরকার চাইলেই সেখান থেকে কৃষিতে দক্ষ কর্মীদের সনদ দিতে পারে, যাতে শুধু দক্ষরা কৃষিকাজে বিদেশ যান।

জনশক্তি খাতের পুরোনো সমস্যা উচ্চ অভিবাসন ব্যয়। সরকারও এবার তা স্বীকার করে নিয়েছে। গত রোববার প্রকাশিত পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) জরিপে বলা হয়েছে, বিদেশ যেতে সরকার নির্ধারিত খরচের আড়াই গুণ ব্যয় হয় একজন কর্মীর। এ টাকা তুলতে তার ১৮ মাস লেগে যায়। নারী কর্মীর গড় অভিবাসন ব্যয় এক লাখ ১০২ টাকা আর পুরুষ কর্মীর চার লাখ ৭১ হাজার ৬৬৮ টাকা। সিঙ্গাপুর যাওয়ার ব্যয় সরকার দুই লাখ ৬২ হাজার ২৭০ টাকা বেঁধে দিলেও বাস্তবে খরচ হচ্ছে পাঁচ লাখ ৭৪ হাজার ২৪১ টাকা। সৌদি আরবে লাগছে এক লাখ ৬৫ হাজার টাকার জায়গায় চার লাখ ৩৬ হাজার ৩৬৬ টাকা এবং মালয়েশিয়ায় এক লাখ ৬০ হাজার টাকার জায়গায় চার লাখ চার হাজার ৪৪৮ টাকা। বিদেশ যাওয়ার ঋণ শোধ করতে না পেরে ১৩ শতাংশ প্রবাসী সম্পদ হারান। জনশক্তি-সংশ্নিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, অবৈধভাবে ভিসা কেনাবেচা, কয়েক স্তরের দালাল ও রিক্রুটিং এজেন্সির পকেটে যায় বাড়তি টাকা।

বিএমইটির মহাপরিচালক মো. শামসুল আলম বলেছেন, কর্মীদের দক্ষতা বাড়াতে সবচেয়ে বেশি জোর দিচ্ছে সরকার। ৬৪টি কারিগরি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট (টিটিসি) কাজ করছে। নতুন আরও ৭১টি টিটিসি করা হচ্ছে। অভিবাসন ব্যয় কমাতে অভিযোগ পেলেই ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স স্থগিত ও বাতিল করা হচ্ছে।