খাল দৃষ্টিনন্দন করতে হাজার কোটি টাকার প্রকল্প

রাজধানীর চারটি খাল নিয়ে মহাপরিকল্পনা করেছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। নতুন এ পরিকল্পনার মাধ্যমে খালগুলো দৃষ্টিনন্দন করা হবে। প্রতিটি খালে থাকবে স্বচ্ছ পানির প্রবাহ। দু’পাশে থাকবে ওয়াকওয়ে, সাইকেল লেন, সবুজায়ন, ফুডপার্ক, বাচ্চাদের খেলার জায়গা, নান্দনিক বাতি, ফোয়ারা প্রভৃতি। এ জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৯৮৫ কোটি ৪২ লাখ ৪৭ হাজার টাকা। প্রতিটি খালের জন্য পৃথক ব্যয় নির্ধারণ করে একটি প্রকল্পপত্র তৈরি করে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে ডিএসসিসি। মন্ত্রণালয় যাচাই-বাছাই করে বাকি প্রক্রিয়া সম্পন্নের ব্যবস্থা নেবে। সংশ্নিষ্ট সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

প্রকল্পপত্র প্রণয়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত ডিএসসিসির প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ সিরাজুল ইসলাম সমকালকে বলেন, যে ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে, সেটা ধারণামাত্র। এই ব্যয় কমবেশি হতে পারে। এ জন্য সরকারের সহযোগিতা প্রয়োজন হবে। কারণ, এত বড় প্রকল্প ডিএসসিসির নিজস্ব অর্থায়নে বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। সরকার অর্থায়ন করলে পাঁচ বছরের মধ্যেই পুরো প্রকল্পের কাজ শেষ করা সম্ভব হবে।

এদিকে, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনও (ডিএনসিসি) নড়েচড়ে বসেছে। মাঝেমধ্যেই খাল দখলমুক্ত করার অভিযান চালাচ্ছে। এ প্রসঙ্গে ডিএনসিসির অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী এ কে এম শরিফ উদ্দিন সমকালকে বলেন, ডিএনসিসি এলাকার খালগুলো নিয়ে আগেই ওয়াসার সঙ্গে ডিএনসিসির একটি প্রকল্প অনুমোদন করা ছিল। প্রায় সাড়ে ছয়শ কোটি টাকার প্রকল্পের মধ্যে ওয়াকওয়ে, সাইকেল লেন, পাড় বাঁধাই প্রভৃতি বিষয় অন্তর্ভুক্ত ছিল। এখন যেহেতু পুরো খালের দায়িত্ব দুই সিটি করপোরেশনের অধীনে চলে এসেছে এবং খাল উন্নয়নে ভালো কিছু করার চিন্তা হচ্ছে, সে জন্য আগের অনুমোদিত প্রকল্পপত্রটি সংশোধন করে আরও কিছু বিষয় যুক্ত করা হবে। আশা আছে খাল নিয়ে ভালো কিছু করার।

দীর্ঘদিন ধরেই খাল নিয়ে ঢাকা ওয়াসা ও ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের মধ্যে টানাহেঁচড়া চলছিল। এ প্রেক্ষাপটে গত ৩১ ডিসেম্বর রাজধানীর খালগুলো ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের হাতে ন্যস্ত করার জন্য ঢাকা ওয়াসার সঙ্গে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। এর পর থেকেই খালগুলোর অভিভাবক এখন দুই সিটি করপোরেশন। দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকেই দুই সিটি করপোরেশন খাল রক্ষণাবেক্ষণ ও আধুনিকায়নের ব্যাপারে তৎপর হয়ে উঠেছে। প্রায় প্রতিদিনই খাল থেকে অবৈধ দখল উচ্ছেদ হচ্ছে। পাশাপাশি ডিএসসিসিও খালের পানিপ্রবাহ নিশ্চিত করার জন্য ময়লা-আবর্জনা অপসারণ করছে। চুক্তির পরই ডিএসসিসি মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস সংশ্নিষ্ট প্রকৌশলীদের খাল নিয়ে পরিকল্পনা প্রণয়নের নির্দেশ দেন। মেয়রের নির্দেশনা অনুসরণ করে ডিএসসিসি চারটি খালের প্রকল্পপত্র তৈরি করেছে।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সভাপতি ও নগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক আখতার মাহমুদ সমকালকে বলেন, খাল যদি আমরা ভালো রাখতে চাই, তাহলে আগে খালের পানিপ্রবাহটা নিশ্চিত করতে হবে। খালের দু’পাশে ওয়াকওয়ে তৈরি করতে হবে। কেউ যাতে কঠিন বর্জ্য খালে ফেলতে না পারে, সে ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি খালের পাড়ে সবুজায়ন করতে হবে। কোথাও যদি গণপরিসরের জায়গা থাকে, সেটাও করতে হবে। কিন্তু অনেক সময় দেখা যায়, এমনভাবে প্রকল্পপত্র তৈরি করা হয়, তাতে মূল লক্ষ্য গৌণ হয়ে যায়। এগুলো করার পর বাকি কাজগুলোও তখন সহজ হয়ে যাবে।

ডিএসসিসির তৈরি প্রকল্পপত্রে কালুনগর খাল, জিরানী খাল, মাণ্ডা খাল ও শ্যামপুর খাল উন্নয়নের কথা বলা হয়েছে। ডিএসসিসি এলাকায় এগুলোই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খাল। এ ছাড়া আরও কিছু রয়েছে, সেগুলো ডিএসসিসি নিজস্ব উদ্যোগেই আধুনিকায়ন করতে পারবে বলে জানা গেছে।

কালুনগর খালের দৈর্ঘ্য ৩ কিলোমিটার, প্রস্থ স্থানভেদে ৭ থেকে ১৫ মিটার। জিরানী খালের দৈর্ঘ্য ৩ দশমিক ৪ কিলোমিটার, গড় প্রস্থ ২০ মিটার। মাণ্ডা খালের দৈর্ঘ্য ৮ দশমিক ২ কিলোমিটার। প্রস্থ ৫ থেকে ৪০ মিটার। এ ছাড়া শ্যামপুর খালের দৈর্ঘ্য ৫ কিলোমিটার ও প্রস্থ গড়ে ১২ মিটার। প্রতিটি খালের জন্য প্রয়োজনে কিছু জমি অধিগ্রহণ করা হবে। পাশাপাশি খালগুলো খনন করে পানিপ্রবাহ নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি হবে আধুনিকায়ন।

কালুনগর খাল :প্রকল্পপত্রে কালুনগর খালে ৫০০টি নান্দনিক বাতি বসানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে। এ ছাড়া সৌরবিদ্যুৎ প্যানেল থাকবে ২৫০টি। ৩০ হাজার বর্গমিটার এলাকায় করা হবে সবুজায়ন। ওয়াকওয়ে হবে ২০ হাজার বর্গমিটারে। বাইসাইকেল লেন হবে ১০ হাজার বর্গমিটার। ফুডকোর্ট ও কফিশপ থাকবে দুটি। বসার বেঞ্চ ও শেড থাকবে ৮০টি। ২০০টি থাকবে ময়লা ফেলার জন্য ওয়েস্টবিন। প্লাজা থাকবে দুটি। সাইট দর্শনের জন্য থাকবে দুটি পয়েন্ট। পাঁচ হাজার বর্গমিটার এলাকাজুড়ে হবে বাচ্চাদের খেলার জায়গা। দুটি থাকবে পাবলিক টয়লেট। পার্কিং স্পেস থাকবে দুটি। দুটি থাকবে ব্যায়ামাগার। এ ছাড়া ফোয়ারা, পাম্পহাউস, স্লুইসগেটসহ আরও বেশ কিছু স্থাপনা তৈরি করা হবে।

জিরানী খাল :জিরানী খালে থাকবে এক হাজার নান্দনিক বাতি, ৫০০টি সোলার প্যানেল, ৪০ হাজার বর্গমিটার সবুজায়ন, চারটি ফুট ওভারব্রিজ, আড়াই হাজার বর্গমিটার সাইকেল লেন, পাঁচটি মাছ ধরার স্থান, চারটি ফুডকোর্ট, একটি প্লাজা, ১০টি বসার বেঞ্চ ও শেড, ১৫০টি ওয়েস্টবিন, পাঁচটি সাইট দর্শনের স্থান, ১০ হাজার বর্গমিটার জায়গায় হবে বাচ্চাদের জন্য ইকোপার্ক, দুটি পাবলিক টয়লেট, দুটি পার্কিং স্পেস, দুটি সেতু, একটি ফোয়ারা প্রভৃতি।

মাণ্ডা খাল :এ খালে নান্দনিক বাতি বসবে এক হাজার ৮০০টি, সৌর প্যানেল ৮০০টি, ৫০ হাজার বর্গমিটার এলাকায় সবুজায়ন, ১০ হাজার বর্গমিটার জায়গাজুড়ে ইকোপার্ক, তিনটি পার্কিং, ৩০ হাজার বর্গমিটারে ওয়াকওয়ে, ১০ হাজার বর্গমিটারে সাইকেল লেন, ১৫টি মাছ ধরার স্থান, ছয়টি ফুডকোর্ট, চারটি প্লাজা, ১৪০টি বসার বেঞ্চ ও শেড, ২৫০টি ওয়েস্টবিন, সাতটি সাইট দর্শনের স্থান, দুটি পাবলিক টয়লেট, চারটি ব্যায়ামগার, ছয়টি ফুট ওভারব্রিজ, চারটি সেতু প্রভৃতি।

শ্যামপুর খাল :শ্যামপুর খালে থাকবে এক হাজার নান্দনিক বাতি, ৫০০টি সৌর প্যানেল, ২০ হাজার বর্গমিটারে সবুজায়ন, ২০ হাজার বর্গমিটারে ওয়াকওয়ে, দুটি ফুডকোর্ট, একটি প্লাজা, ৯০টি বসার বেঞ্চ, ১৫০টি ওয়েস্টবিন, তিনটি সাইট দর্শনের স্থান, পাঁচ হাজার বর্গমিটারে শিশুদের খেলার জায়গা, একটি পাবলিক টয়লেট, একটি পার্কিং, দুটি ব্যায়ামাগার, একটি ফুট ওভারব্রিজ, দুটি ব্রিজ ও একটি ফোয়ারা।