কমবে বাণিজ্য ঘাটতি ॥ বৃহৎ অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি হচ্ছে

  • আইআইএফটির সঙ্গে সমঝোতা স্মারক সই
  • রফতানি বাড়ার পাশাপাশি ভারতীয় বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাবে
  • নতুন মাইলফলকে পৌঁছাবে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক

এবার ভারতের সঙ্গে হচ্ছে বৃহৎ অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি (কম্প্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ এগ্রিমেন্ট-সিপা)। চুক্তির প্রাথমিক কাজ হিসেবে ইতোমধ্যে ভারতের ইনস্টিটিউট অব ফরেন ট্রেডের (আইআইএফটি) সঙ্গে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করা হয়েছে। যৌথ সমীক্ষা তদারকির জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয় গঠন করেছে দশ সদস্যের একটি উপদেষ্টা কমিটি। সিপা চুক্তির সামগ্রিক বিষয় পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণ করে সমীক্ষা প্রতিবেদন তৈরি করার জন্য কাজ শুরু করেছে বাংলাদেশ ফরেন ট্রেড ইনস্টিটিউট (বিএফটিআই)। সংস্থাটির প্রাথমিক মন্তব্যে সিপা চুক্তি বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে ধারণা দেয়া হয়েছে। এতে বলা হয়, চুক্তিটির পর বাংলাদেশে ভারতের অবাধ বিনিয়োগের পথ প্রশস্ত হবে। পণ্য রফতানির পাশাপাশি সেবা রফতানির সুযোগ পাবে বাংলাদেশ। ভারতের বিশাল বাজারে এই সুবিধা পেলে বাংলাদেশ ব্যাপকভাবে লাভবান হতে পারবে। দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক পৌঁছাবে নতুন মাইলফলকে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ভারতের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তির আওতায় আমদানি-রফতানি কার্যক্রম পরিচালিত হয়। একক দেশ হিসেবে চীনের পর ভারত বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার। বাংলাদেশ-ভারত বাণিজ্যের সম্ভাব্য পরিমাণ প্রায় ৯ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার। বড় অঙ্কের এই বাণিজ্য বরাবরই ভারতের অনুকূলে। ভোগ্যপণ্য ও শিল্পের কাঁচামালের প্রধান উৎস ভারত। ফলে প্রতিবছর বাণিজ্য ঘাটতি বাড়ছেই। এই ঘাটতি দূর করতে ভারতে রফতানি বাড়ানোর পাশাপাশি বাংলাদেশে ভারতীয় বিনিয়োগ আকর্ষণে এক্ষেত্রে মনোযোগ দিতে হবে। সিপা বড় ধরনের ভূমিকা পালন করতে পারে।

আগামী ২০২৪ সালে চূড়ান্তভাবে স্বল্পোন্নত (এলডিসি) দেশের কাতার থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ ঘটবে। তখন দুই দেশের মধ্যে ব্যবসা ও বাণিজ্য বাড়াতে নতুন দ্বিপক্ষীয় চুক্তির প্রয়োজন হবে। সেই চিন্তা থেকেই বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের স্বার্থে সিপার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এই চুক্তির আওতায় পণ্য পরিসেবা ও বিনিয়োগের মতো জিনিস থাকবে। দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তির আওতায় ভারতে এখন শুধু পণ্য রফতানি হয়ে থাকে। সিপার পর সেবা রফতানি উন্মুক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। বিশেষ করে ব্যাংক ও বীমা সার্ভিসের আওতা বাড়বে। বাড়বে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান। এ প্রসঙ্গে বাণিজ্য সচিব ড. জাফর উদ্দীন জনকণ্ঠকে বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে যে বাণিজ্য চুক্তি সাফটা আছে, ভারতের বাজারে বাংলাদেশকে অবাধে ঢুকতে হলে সেটা এখন আর যথেষ্ট নয়। এ কারণে দ্বিপক্ষীয় পর্যায়ে সিপার প্রয়োজন রয়েছে। বাংলাদেশ-ভারত বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে করা হচ্ছে এই চুক্তি। এই চুক্তির ফলে বাংলাদেশের সেবা রফতানি বাড়বে এবং কমবে বাণিজ্য ঘাটতি।

তিনি বলেন, ভারতের পক্ষ থেকে প্রথম সিপার প্রস্তাব দেয়া হলেও এখন বাংলাদেশও এই চুক্তির ব্যাপারে আগ্রহী। চুক্তিটি দ্রুত করতে বাংলাদেশের পক্ষে বিএফটিআই এবং ভারতের পক্ষে আইআইএফটি সম্ভাব্যতা যাচাই-বাছাইয়ের কাজ শুরু করেছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে বিশদ প্রতিবেদন তৈরি ও সুষ্ঠুভাবে কাজ করার স্বার্থে বিএফটিআইকে বিশেষ বাজেট বরাদ্দ দিয়েছে। আশা করা হচ্ছে, শীঘ্রই চূড়ান্ত প্রতিবেদন পাওয়া যাবে। তিনি বলেন, সরকারের লক্ষ্য রূপকল্প-২০২১ এবং স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর এই বছরেই সিপা চুক্তি করা। এলক্ষ্যে সব ধরনের প্রস্তুতি এগিয়ে চলছে।

জানা গেছে, ভারতে পণ্য রফতানির ক্ষেত্রে শুল্ক-অশুল্ক জনিত বাধা একটি বড় সমস্যা। এছাড়া বাংলাদেশী পণ্যের ওপর এ্যান্টি-ডাম্পিং ডিউটি ও কাউন্টারভেইলিং ডিউটি আরোপ করে রেখেছে দেশটি। ব্যবসায়ীদের জন্য সহজে ভিসা প্রাপ্তি একটি বড় সমস্যার নাম। এসবের প্রভাব বাণিজ্যে মারাত্মক ক্ষতিকর আকার ধারণ করছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সিপা চুক্তি থাকলে অনেক বিষয়ের সহজ সমাধান সম্ভব। ভারত এখন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সিপা চুক্তি করছে। ভারতের বর্তমান আমদানি বাজারের সুবিধা ঠিকমতো নিতে পারছে না বাংলাদেশ। ভারত বিশ্ববাজার থেকে অনেক পণ্য কিনছে, কিন্তু বাংলাদেশ থেকে নয়। একই জাতের পণ্য বিশ্ববাজারে পাঠাচ্ছে বাংলাদেশ, কিন্তু ভারতে নয়। বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের প্রায় অর্ধেক স্থলবন্দরগুলোর মাধ্যমে হয়ে থাকে। এর জন্য নো ম্যানস ল্যান্ডে পণ্য খালাস ও উত্তোলন করতে হয়। এতে একদিকে বিলম্ব ঘটে, অন্যদিকে পণ্যের দাম চড়ে। মিউচুয়াল রিকগনিশন এ্যাগ্রিমেন্ট না থাকায় দূরবর্তী টেস্টিং সেন্টার থেকে পরীক্ষণ-সমীক্ষণের ফলাফল না আসা পর্যন্ত পণ্য পড়ে থাকে।

ঢাকা-দিল্লী পণ্য পরিবহন খরচ ঢাকা থেকে ইউরোপীয় বা মার্কিন বন্দরে পরিবহন খরচের চেয়ে অনেক বেশি। বাণিজ্য-সংযোগের কার্যকারিতা পরিবহন, বিনিয়োগ ও লজিস্টিকস কানেক্টিভিটির কার্যকারিতার ওপর নির্ভর করে। সাফটা চুক্তির অংশ হিসেবে ভারত তার বাজারে বাংলাদেশকে শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত সুবিধা দিয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ তা কাজে লাগাতে পারছে না। এ প্রসঙ্গে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের নীতি নির্ধারকদের অবশ্যই ভারতের বিকাশমান অর্থনৈতিক বন্ধনের নিরিখে সমন্বিত কৌশল নির্ধারণ করতে হবে। দীর্ঘ মেয়াদে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটতে যাচ্ছে বলেই প্রতীয়মান হয়। ঢাকা যদি সম্পর্কের সম্ভাব্য সুবিধা পুরোপুরি নিতে চায়, তাহলে তাকে অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে। তিনি বলেন, বাংলাদেশের বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার ভারত। বড় এই দেশটির সঙ্গে যেকোন চুক্তি করার আগে এর সম্ভাব্যতা গভীরভাবে যাচাই-বাছাই করা প্রয়োজন।

সেবা খাতে রফতানি বাড়বে ॥ ভারত থেকে ভোগ্যপণ্যসহ শিল্পের কাঁচামাল সবচেয়ে বেশি আমদানি হয়ে থাকে। চাল, পেঁয়াজ, মসলা, তুলা, বিভিন্ন মেশিনারিজ আমদানি করা হয়। এর পাশাপাশি ভারতের মেডিক্যাল পর্যটনে বাংলাদেশ বড় ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয়েছে। প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক মানুষ ভারতে চিকিৎসার জন্য যাচ্ছেন। ভারতীয় ওষুধও এদেশে আসছে। কিন্তু পাটজাতীয় কিছু পণ্য, ইলিশ মাছ ও হ্যান্ডিক্রাফট ছাড়া ভারতে তেমন কিছু রফতানি হয় না। গত কয়েক বছরে সার্ভিস খাতে বাংলাদেশ ভাল করছে। বিশেষ করে ব্যাংক, বীমা, চিকিৎসা এবং আইটি খাতে বাংলাদেশ এক সফল দেশ। এ কারণে এসব খাতে উভয় দেশ আরও মনোযোগ দিতে পারবে। সিপা চুক্তির আওতায় বাংলাদেশের সার্ভিস খাত সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে বলে মনে করছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। ভারত থেকে এখন বিদ্যুত আমদানি করা হচ্ছে। ক্রমেই বাড়ছে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে ভারতকে ট্রানজিট সুবিধা দেয়ায় এখন সহজে সেভেন সিস্টারস খ্যাত সাত রাজ্যে ভারত তার পণ্য পাঠাতে পারছে। এতে করে উভয়দেশ লাভবান হচ্ছে। এছাড়া বৃহৎ পরিসরে আমদানি-রফতানি কার্যক্রম জোরদার করতে বাংলাদেশ-ভুটান, ভারত ও নেপালের মধ্যে বিবিআইন চুক্তি করা হবে। ভুটান এ চুক্তিতে সম্মত না হলে তিনদেশ মিলেই এ চুক্তিতে সই করা হতে পারে বলে জানা গেছে।

উন্নয়নে অংশীদার ভারত ॥ প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত বাংলাদেশের উন্নয়ন অংশীদার হিসেবেও কাজ করছে। ভারতের ঋণ কর্মসূচীর আওতায় বাংলাদেশ সবচেয়ে বড় উন্নয়ন অংশীদার। বাংলাদেশ সরকারের কাছে ঋণচুক্তির অধীনে ভারত সরকারের মোট প্রতিশ্রুতি ৭ হাজার ৮৬২ মিলিয়ন ডলার। বর্তমানে ভারত সরকারের তিনটি ঋণচুক্তির আওতাধীন ৪৬টি প্রকল্পের মধ্যে ১৪টি প্রকল্প সম্পন্ন হয়েছে। ৮টি প্রকল্প চলমান রয়েছে, ১৫টি প্রকল্প দরপত্র পর্যায়ে এবং ১৪টি প্রকল্প ডিপিপি প্রস্তুতি পর্যায়ে রয়েছে। বাংলাদেশ সরকারের প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলোর সঙ্গে এ পর্যন্ত প্রায় ১২৭৬ দশমিক ৩৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যেও চুক্তি স্বাক্ষর করেছে ভারত। যা মোট ঋণচুক্তির ১৭ শতাংশ। এ জাতীয় চুক্তির আওতায় ভারতীয় এক্সিম ব্যাংক এ পর্যন্ত ৭১৯ দশমিক ৭৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিতরণ করেছে। প্রথম ঋণচুক্তির ২০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার অনুদানে রূপান্তরিত করা হয়েছে। প্রকল্পের অগ্রগতি ত্বরান্বিত করতে এবং এলওসি তহবিলের প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে সমস্যাগুলোর সমাধান এবং প্রকল্প এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেয়ার জন্য উচ্চস্তর প্রকল্প পর্যবেক্ষণ কমিটি রয়েছে বলে জানা গেছে। তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি করার ব্যাপারে বাংলাদেশ সরকার আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। এছাড়া ভারতের সঙ্গে অমীমাংসিত যেসব বিষয় রয়েছে সেগুলোর সমাধানের উদ্যোগ থাকবে সিপায়।