ভেজাল ও বিষাক্ত মদের বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযান

 

ঢাকায় ও আশপাশের এলাকায় বিষাক্ত মদপানে এক ডজন তরতাজা যুবক-যুবতীর মৃত্যুর ঘটনায় টনক নড়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর। ময়নাতদন্তের আগেই প্রাথমিকভাবে পুলিশ নিশ্চিত হয়েছে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ভেজাল বিদেশী মদপানে তাদের জীবনে সর্বনাশ ঘটেছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে সোমবার রাতেই রাজধানী ও আশপাশের জেলায় সাঁড়াশি অভিযান শুরু করে পুলিশ ও মাদকদ্রব্য বিভাগ। সোমবার থেকে বিভিন্ন স্থানে চালানো এসব সাঁড়াশি অভিযানে পুলিশ সন্ধান পেয়েছে বিশাল এক মদের কারাখানার। প্রথম রাতেই ধরা পড়ে ৬ মাদক কারবারি। তাদের তত্ত্বাবধানে তৈরিকৃত দেশীয় চোলাইমদ ও হোমিওপ্যাথির দোকান থেকে সরবরাহকারী স্পিরিট খেয়েই এসব মাদকাসক্তের প্রাণহাণি ঘটেছে। যদিও বেঁচে যাওয়া যুবক যুবতীদের অভিযোগ অস্বীকার করে ওয়্যারহাউসের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে- রাজধানীতে বর্তমানে বিদেশী মদ বিয়ারের সঙ্কট দেখা দেয়ায় বিভিন্ন ক্লাবে বিভিন্ন সোর্স থেকে বিদেশী মদ বিয়ার সংগ্রহ করা হয়। যেগুলো নকল বা বিষাক্ত উপাদানে তৈরি। হঠাৎ ওয়্যারহাউসগুলোতে মদ বিয়ারের সঙ্কট দেখা দেয়ায় বারগুলোতেও দেখা দেয় সঙ্কট। আগের মতো আর আমদানি করছে না তারা। এ সুযোগেই রাজধানীতে বেপরোয়া হয়ে ওঠে নকল মদ তৈরির একটি সিন্ডিকেট। যারা একদিনেই প্রায় এক হাজার লিটার মদ বাজারজাত করতে পারে। পুলিশ এমন তথ্য হাতে নিয়েই সোমবার রাতে সাঁড়াশি অভিযান চালিয়েছে নগরজুড়ে। গত কদিনে মৃত্যুর ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটনসহ ৬ জনকে গ্রেফতার করে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা গুলশান বিভাগ। এ সময় ভেজাল মদ তৈরির কারখানার সন্ধানসহ বিপুল পরিমাণ ভেজাল মদ ও মদ তৈরির বিভিন্ন সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়। গ্রেফতাররা হলেন- মনতোষ চন্দ্র অধিকারী ওরফে আকাশ (৩৫), রেদুয়ান উল্লাহ (৩৫), সাগর বেপারি (২৭), নাসির আহমেদ ওরফে রুহুল (৪৮), মোঃ জাহাঙ্গীর আলম (৪৫) ও সৈয়দ আল আমিন (৩০)। সোমবার রাত ৯টার দিকে রাজধানীর তেজগাঁও ও ভাটারা থানা এলাকায় বিশেষ অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেফতার করে গুলশান ডিবি পুলিশের একটি দল।
পুলিশ জানায়, গত কয়েকদিন মদপান করার পর অসুস্থ হয়ে ভাটারা থানা এলাকায় তিনজন, ক্যান্টনমেন্ট থানা এলাকায় একজন ও মোহাম্মদপুর থানা এলাকায় দুইজনসহ মোট ছয়জনের মৃত্যু হয়। যা রাজধানীসহ দেশব্যাপী আলোড়ন তৈরি করে। এসব ঘটনায় সংশ্লিষ্ট থানায় মামলা রজু হয়। মামলাগুলো থানা পুলিশের পাশাপাশি ছায়া তদন্ত শুরু করে গোয়েন্দা গুলশান বিভাগ। তদন্তে ক্যান্টনমেন্ট থানা এলাকায় মদপানে মৃত্যুর ঘটনাস্থল থেকে পাওয়া সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, দুই ব্যক্তি মোটরসাইকেলযোগে এসে এক বোতল মদ ভিকটিমকে দিয়ে চলে যায়। যা সেবন করে ভিকটিমের মৃত্যু হয়। পরবর্তী সময়ে ওই দুই ব্যক্তিকে শনাক্ত করে গোয়েন্দা পুলিশ। এরপর সোমবার রাত ৯টার দিকে তেজগাঁওয়ের ইয়ানতুন চাইনিজ রেস্টুরেন্টের সামনে হতে মনতোষ, রেদুয়ান ও সাগরকে গ্রেফতার করা হয়। পরে তাদের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে ভাটারা থানার খিলবাড়িরটেক এলাকার একটি বাসায় অভিযান চালিয়ে ভেজাল মদ তৈরির কারখানার সন্ধানসহ কারখানার মালিক নাসির, ম্যানেজার আল আমিন ও কারিগর জাহাঙ্গীরকে গ্রেফতার করা হয়। এ সময় ভেজাল মদের কারখানা থেকে নকল বিদেশী মদ, মদের খালি বোতল, মদের বোতলের মুখ আটকানো কর্ক, স্টিকার, স্পিরিট, কৃত্রিম রংসহ বিপুল পরিমাণ সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, এই চক্রের হোতা নাসির ভেজাল মদ তৈরি করে বিক্রি করতেন। সাম্প্রতিক সময়ে ওয়্যারহাউসগুলো থেকে মদ ক্রয়-বিক্রয়ে কড়াকড়ি থাকায় বাজারে মদের সঙ্কট তৈরি হয়। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে তারা ভেজাল মদ তৈরির কারখানা গড়ে তুলে। তারা ভেজাল মদ তৈরির উপকরণ স্পিরিট, স্টিকার ও রং মিটফোর্ট হাসপাতালের আশপাশ এলাকা থেকে সংগ্রহ করতেন। এরপর সেগুলো দিয়ে চিনি পোড়ানো কালার ব্যবহার করে ভেজাল মদ তৈরি করতেন। তৈরি করা ভেজাল মদ চক্রের অন্য সদস্যদের দিয়ে বিভিন্ন খুচরা ও পাইকারি বিক্রেতাদের কাছে বিক্রি করতেন তারা। তাদের মাধ্যমে ভেজাল মদ চলে যেত সেবনকারীদের কাছে। মোহাম্মদপুর ও ভাটারা থানা এলাকায় মদপানে যে পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে সেগুলোও গ্রেফতারদের কারখানাতেই তৈরি করা ভেজাল মদ বলে গোয়েন্দা তদন্তে বেরিয়ে এসেছে। এ ঘটনায় গ্রেফতারদের বিরুদ্ধে ভাটারা থানায় মামলা রুজুু করা হয়েছে।

তদন্তে ক্যান্টনমেন্ট থানা এলাকায় মদ সেবনে মৃত্যুর ঘটনাস্থল থেকে প্রাপ্ত সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, দুইজন ব্যক্তি মোটরসাইকেলযোগে এসে এক বোতল মদ ভিকটিমকে দিয়ে চলে যায়। যা সেবন করে ভিকটিমের মৃত্যু হয়। পরবর্তী সময়ে ওই দুই ব্যক্তিকে শনাক্ত করে গোয়েন্দা পুলিশ। এরপর সোমবার রাত ৮:৪৫ টায় তেজগাঁওয়ের ইয়ানতুন চাইনিজ রেস্টুরেন্টের সামনে হতে মনতোষ, রেদুয়ান ও সাগরকে গ্রেফতার করা হয়। তাদের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে ভাটারা থানার খিলবাড়িরটেক এলাকার একটি বাসায় অভিযান চালিয়ে ভেজাল মদ তৈরির কারখানার সন্ধানসহ কারখানার মালিক নাসির, ম্যানেজার আল আমিন ও কারিগর জাহাঙ্গীরকে গ্রেফতার করা হয়। এ সময় ভেজাল মদের কারখানা থেকে নকল বিদেশী মদ, মদের খালি বোতল, মদের বোতলেরর মুখ আটকানো কর্ক, স্টিকার, স্পিরিট, কৃত্রিম রংসহ বিপুল পরিমাণ সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়।

এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের জনসংযোগ শাখার উপপুলিশ কমিশনার ওয়ালিদ হোসেন জানান, অভিযান চলছে। রাজধানীতে এ ধরনের যত আস্তানা আছে সবই গুঁড়িয়ে দেয়া হবে। গ্রেফতার করা হবে নকল মদ তৈরির সঙ্গে জড়িতদের।