১৯৪৯ সাল :: আওয়ামীলীগের জন্ম ”রোজ গার্ডেন”-এ

 

রোজ গার্ডেন

রোজ গার্ডেন

কালের সাক্ষী রোজ গার্ডেন

দৈনিক জনকন্ঠ : বিল্ডিংয়ের শহর ঢাকা। পুরনো বাড়ি অনেক আছে। সুরম্য অট্টালিকাও গুনে শেষ করা যাবে না। এরপরও একটি বাড়ির কথা আলাদা করে বলা হয়। পুরান ঢাকায় অবস্থিত প্রাসাদোপম বাড়িটির নাম রোজ গার্ডেন। অনেকেই চেনেন। নির্মাণশৈলীর দিক থেকে এ বাড়ি অনন্য। অসাধারণ। দীর্ঘকাল রোদে পুড়েছে। বৃষ্টিতে ভিজেছে। কিছুটা মলিন চেহারা এখন। কিন্তু আলোজ্জ্বল ইতিহাসের সাক্ষী। বাংলাদেশের সবচেয়ে পুরনো এবং ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ গঠন করা হয়েছিল এ বাড়িতে বসেই। গৌরবের সেই স্মৃতি বুকে এখনও দাঁড়িয়ে আছে রোজ গার্ডেন।

নান্দনিক সৌন্দর্যে অতুলনীয় এই বাড়ি টিকাটুলির কে এম দাস লেনে অবস্থিত। নির্মিত হয়েছিল সেই ১৯৩০ সালে। উন্নত রুচি ও অভিজাত দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ভবনটি নির্মাণ করেন জমিদার হৃষিকেশ দাস। সাত একর জমির উপর বিশাল দৃষ্টিনন্দন ভবন। বাড়ির মতোই সুন্দর চার পাশ। উদ্যানে চমৎকার ফুলের বাগান করা হয়েছিল। বিশেষভাবে দৃশ্যমান হতো গোলাপ। হরেক রকমের গোলাপ ফুটে থাকত বাগানে। বাগানের জন্য চীন, ভারত, জাপান ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে মাটিসহ গোলাপের চারা এনে লাগানো হয়েছিল। যতদূর তথ্য, এ কারণেই বাড়িটির নাম রোজ গার্ডেন।

অনিন্দ্য সুন্দর স্থাপনা উঁচু প্রাচীর দিয়ে ঘেরা। সাত হাজার বর্গফুট আয়তনের প্রাচীর। ভেতরে প্রবেশ করলে পুরো বাড়িটি দেখা যায়। যেন ভারতীয় সিনেমায় দেখা বড় বড় রাজপ্রাসাদগুলোর একটি। মনে হয়, রাজা মহারাজা উজির নাজির ধরনের কেউ এখনই বের হয়ে আসবেন! ভবনের উপরিভাগ গম্বুজ আকৃতির। উচ্চতা প্রায় ৪৫ ফুট। ভিত্তির উপর ছয়টি বিভিন্ন উচ্চতার থাম। প্রতিটি থামের উপরিভাগে দৃষ্টিনন্দন নক্সা করা। পাঁচটি অংশে বিভক্ত বাড়ির সবকটি বারান্দা থেকে বাগানের সৌন্দর্য দেখা যায়।

পশ্চিম দিকে মুখ করা বাড়ির সামনের অংশ সবচেয়ে আকর্ষণীয়। সুন্দর। দূর থেকে দেখেই মন ভরে যায়। ভবনের প্রবেশদ্বারগুলোতে কাঠ ছাড়াও ব্যবহার করা হয়েছে লোহা ও রঙিন বেলজীয় কাঁচ। ফুল লতা পাতার নক্সা করা হয়েছে। আছে বিভিন্ন প্রাণীর চেহারা। তিন তলা বাড়িতে মোট ১৩টি ছোট বড় কক্ষ। দ্বিতীয় তলায় বিশাল বলরুম। শ্বেত পাথরে গড়া মেঝে। সিলিংয়ে সবুজ কাঁচ। সেখানে ফুলের নক্সা। ভবনের অভ্যন্তরে দারুণ সব ঝাড়বাতি। ছাদে যাওয়ার জন্য রয়েছে প্যাঁচানো সিঁড়ি। এটিও নক্সা করা। বাগানে সুনিপুন হাতে গড়া ভাস্কর্য। আছে ঝর্ণা ও পুকুর। সব মিলিয়ে অপূর্ব।

ইতিহাসবিদদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ১৯৬৩ সালে বাড়িটি কিনে নেন ব্যবসায়ী খান বাহাদুর কাজী আবদুর রশীদ। ১৯৩৭ সাল থেকে বাড়িতে সপরিবারে বসবাস শুরু করেন তিনি। তখন রোজ গার্ডেনের নতুন নাম হয় রশীদ মঞ্জিল। ১৯৬৬ সালে রশিদের দ্বিতীয় পুত্র কাজী আব্দুর রকিব বেঙ্গল স্টুডিও এ্যান্ড মোশন পিকচার্সের কাছে এই সম্পত্তি লিজ দিয়ে দেন। রাজা বাদশা জমিদারদের কাহিনী নির্ভর অনেক চলচ্চিত্রের শুটিং হয় এখানে। সে সময় বেঙ্গল স্টুডিও নামে পরিচিতি পায় ঐতিহাসিক ভবন।

এভাবে নানা ইতিহাসের সাক্ষী হয় রোজ গার্ডেন। তবে সবচেয়ে বেশি আলোচিত আওয়ামী লীগের জন্মের ইতিহাসের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে। জানা যায়, বাড়িটি হৃষিকেশের সময়ই গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক উৎসব অনুষ্ঠানের কেন্দ্রস্থল হয়ে ওঠেছিল। ভারত বিভাগের পর অনেক গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সভা এখানে অনুষ্ঠিত হয়েছে। বাংলাদেশ ও ভারতের বড় বড় নেতাদের এখানে আসা যাওয়া ছিল। এরই ধারবাহিকতায় ১৯৪৯ সালে বাড়িটি আওয়ামী লীগ জন্মের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত হয়। বরেণ্য ইতিহাসবিদ মুনতাসীর মামুন জানান, ওই বছর রোজ গার্ডেনে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও আবুল হাশেমের নেতৃত্বাধীন তৎকালীন বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের একাংশের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলনের মধ্য দিয়ে ২৩ জুন পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠিত হয় বলে জানান তিনি। নবগঠিত দলের সভাপতি নির্বাচিত হন মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। সাধারণ সম্পাদক ছিলেন শামসুল হক। পরবর্তীকালে ১৯৫৫ সালে মওলানা ভাসানীর উদ্যোগে ধর্মনিরপেক্ষতার চর্চা এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে প্রাধান্য দিয়ে নাম রাখা হয় ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ।’ পরবর্তীতে দলটি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ নামে পরিচিতি লাভ করে। ক্ষণজন্মা পুরুষ অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে নতুন প্রাণ পায় দীর্ঘদিনের পুরনো এই দল।

হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, আব্দুল হামিদ খান ভাসানির মতো নেতারা রোজ গার্ডেনে গুরুত্বপূর্ণ মিটিং করেছেন। একইভাবে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্মৃতিধন্য এই বাড়ি। বর্তমানে বাড়িটির মালিক আব্দুর রশিদের মেজ ছেলের স্ত্রী লায়লা রকীবের বর্ণনা থেকে জানা যায়, বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালের ১৪ জানুয়ারি কাজী মোহাম্মদ বশিরের সঙ্গে দেখা করতে রোজ গার্ডেনে গিয়েছিলেন। সাদা গাড়িতে করে আসা নেতাকে সেদিন বাড়ির দুতলার বারান্দা থেকে অবাক বিস্ময়ে দেখেছেন বলে জানান তিনি।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ১৯৮৯ সাল থেকে প্রতœতত্ত্ব অধিদফতর স্থাপনাটি সংরক্ষণের দায়িত্ব পালন করছে। বাড়িটি এখন সংরক্ষিত। তবে আওয়ামী লীগ এ বাড়িতে প্রতিষ্ঠা হয়েছিলÑ গৌরবের সেই ইতিহাসটি সংরক্ষণ করা হয়নি। তেমন কোন উদ্যোগ চোখে পড়েনি।