জাতীয় ঐক্য টিকবে না-আওয়ামী লীগ

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে গঠিত ‘জাতীয় ঐক্যকে’ মুখে স্বাগত জানালেও তাদের কর্মকাণ্ড ও গতিবিধি গুরুত্বের সঙ্গেই পর্যবেক্ষণ করছে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ। ‘দলছুট ও জনবিছিন্ন’ নেতাদের এই জোট খুব বেশি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে না বলেও মনে করেন দলটির নেতারা। আর জাতীয় ঐক্যের এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে বিএনপির যুক্ত হওয়ার পর এটাকে জগাখিচুড়ি ঐক্য বলে আখ্যায়িত করেছেন তারা। ক্ষমতাসীন দলটির নেতাদের মতে, নির্বাচনকে ঘিরে ‘চক্রান্ত-ষড়যন্ত্রের’ পথ ধরে সুবিধা নিতেই তাদের এই তৎপরতা। তবে শেষ পর্যন্ত এই জাতীয় ঐক্য টিকবে না বলেও ধারণা তাদের।

পাঁচ দফা দাবি ও নয়টি লক্ষ্য ঘোষণার মধ্য দিয়ে বৃহত্তর জাতীয় ঐক্যের যাত্রা শুরু করে যুক্তফ্রন্ট। এই জোটে রয়েছেন গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন, বিকল্পধারা বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট ও সাবেক রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক ডা. একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল- জেএসডি সভাপতি আ স ম আবদুর রব, সাবেক ডাকসু ভিপি সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমেদ. গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী ও নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না।

এদিকে শুরু থেকেই এই জোটকে স্বাগত জানানোর পাশাপাশি জোট নেতাদের অতীত কর্মকাণ্ডের সমালোচনায় মুখর ছিল আওয়ামী লীগ। এরই মধ্যে বদরুদ্দোজা চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন ‘যুক্তফ্রন্ট’ এবং ডা. কামালের ‘জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়া’ শনিবার মহানগর নাট্যমঞ্চে নাগরিক সমাবেশ করে। জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার নাগরিক সমাবেশে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নেতৃত্বে যোগ দেন দলটির বেশ কয়েক কেন্দ্রীয় প্রভাবশালী নেতা।

বিএনপির উপস্থিতি ও দলটির নেত্রী খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবির পরে জাতীয় ঐক্যের কর্মকাণ্ডকে আরো বেশি তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে দেখছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। আবার একইসঙ্গে এই ঐক্যের ভবিষ্যৎ নিয়েও শঙ্কা প্রকাশ করছেন দলটির শীর্ষ নেতারা। এ বিষয়ে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, আসলে এটা জগাখিচুড়ি ঐক্য। এই জগাখিচুড়ি ঐক্য শেষ পর্যন্ত টিকবে; এটা আমাদের বিশ্বাস হচ্ছে না। একইসঙ্গে আওয়ামী লীগকে বাদ দিয়ে দেশে জাতীয় ঐক্য সম্ভব নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

এদিকে জাতিসংঘ অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্কে গিয়ে সেখানে স্থানীয় হিলটন হোটেলে এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী হাসিনা নিজেও জাতীয় ঐক্য ও তাদের নাগরিক সমাবেশের সমালোচনা করেন। বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া ও তার দুই ছেলেসহ এই ঐক্য প্রক্রিয়ায় জড়িত কয়েক নেতার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ তুলে ধরে তিনি বলেন, এরা সব এক জায়গায়। কেউ সুদখোর, কেউ ঘুষখোর, কেউ মানি লন্ডারিংয়ের দায়ে অভিযুক্ত, কেউ খুনি। এভাবে সব আজকে এক জায়গায়। এই সমস্ত দুর্নীতিবাজকে নিয়ে দুর্নীতির বিরুদ্ধে যারা কথা বলেন, তারা লড়াই করবেন! কামাল হোসেন লড়াই করবেন? বি চৌধুরী লড়াই করবেন? মান্না লড়াই করবে?

এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বলেন, এক শ্রেণির বর্ণচোরা রাজনৈতিক নেতা ঐক্যের ডাক দিয়েছেন। তারা ঐক্যের নামে ডুবন্ত বিএনপিকে উঠাতে চাচ্ছেন। মরদেহ নিয়ে মাঠে নামার চেষ্টা করবেন না। ঐক্যের নামে ভিন্ন কোনো ফন্দি করলে কোনো ছাড় দেয়া হবে না। ১/১১ এর মতো চক্রান্ত করতে মহানগর নাট্যমঞ্চে দলছুট ও হতাশাগ্রস্ত ব্যক্তিরা নাটক করেছিলেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য লে. কর্নেল (অব.) মুহম্মদ ফারুক খান বলেন, জোট গঠন প্রক্রিয়াকে ইতিবাচকভাবেই দেখে আসছিল আওয়ামী লীগ। তবে জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার সমাবেশে বিএনপির নেতাদের উপস্থিতি ও তাদের দাবি পর্যালোচনায় ষড়যন্ত্রের গন্ধ পাওয়া যায়। দলটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাধক মাহবুবউল আলম হানিফ বলেন, বিএনপি জনসমর্থন না থাকায় বহু চেষ্টা করেও দাবি উত্থাপন বা আন্দোলন কোনোটিই করতে পারেনি। এমনকি বিদেশিদের কাছে ধরনা দিয়েও সফল হয়নি। সর্বশেষ তারা একটি জোট করেছে। কিন্তু এই দল কারা? জনবিচ্ছিন্ন এবং জনগণ থেকে প্রত্যাখ্যাতদের সঙ্গে জোট করে কোনো ফায়দা হবে না।

একই বিষয়ে দলের সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ চৌধুরী বলেন, শনিবার মহানগর নাট্যমঞ্চে রাজনীতির নাটক মঞ্চস্থ করা হয়েছে। বিএনপির মতো একটি দেউলিয়া দল আরেক দেউলিয়া ড. কামালের কাছে আত্মসমর্পণ করে বাঁচতে চায়। দেউলিয়াদের ঐক্য জাতীয় ঐক্য হতে পারে না। এটি মূলত ষড়যন্ত্রের ঐক্য। এটি দেশীয় ষড়যন্ত্র। এ ছাড়াও আন্তর্জাতিক মহলে লুটের টাকা দিয়ে ষড়যন্ত্র করছে। তবে কোনো ষড়যন্ত্র ফলপ্রসূ হবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

দলটির প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ বলেন, এটা জনগণের কোনো ঐক্য নয়। এটা রাজনীতিতে পরিত্যক্ত নেতাদের ঐক্য। ড. কামাল হোসেন জনবিচ্ছিন্ন রাজনীতিতে পরিত্যক্ত। তিনি গণতন্ত্রের কথা বলেন কিন্তু তার নিজের দলেই কোনো গণতন্ত্র নেই। গণফোরামের সম্মেলন কবে হয়েছে তাও তিনি বলতে পারবেন না। ১৮ বছর যাবত তিনি সম্মেলন ছাড়া সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। আর বদরুদ্দোজা চৌধুরীর দলের কখন সম্মেলন হয়েছে তাও হয়তো উনার মনে নেই। প্রকৃতপক্ষে এই জোট হচ্ছে জনবিচ্ছিন্ন, ব্যক্তিসর্বস্ব, নামসর্বস্ব এবং রাজনীতিতে পরিত্যক্তদের একটি জোট। যাদের সঙ্গে জনগণের কোনো সম্পৃক্ততা নেই।

মানবকণ্ঠ