জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ইশতেহার দুর্বল ও বিভ্রান্তিকর

 

নিউজ ডেস্ক : একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে ১৭ ডিসেম্বর ইশতেহার ঘোষণা করেছিলো জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। এদিকে ঐক্যফ্রন্টের নির্বাচনী ইশতেহার পর্যালোচনায় বিভিন্ন অসংগতির বিষয়ে মন্তব্য করেছেন একজন রাজনৈতিক বিশ্লেষক। ঐক্যফ্রন্টের ইশতেহারে সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত হয়েছে বলেও শঙ্কা প্রকাশ করেছেন তিনি। এছাড়া ইশতেহারটিকে রীতিমতো সাধারণ মানুষের সঙ্গে ধোঁকাবাজির সামিল বলেও মনে করেন তিনি।

ইশতেহারে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট প্রতিশ্রুতি দিয়েছে নির্বাচিত হলে সরকার প্রথম বছরে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম বাড়াবে না। তার মানে তারা দ্বিতীয় বছর থেকেই দাম বাড়াবে। সঙ্গে তারা ইশতেহারে লিখেছেন সর্বোচ্চ ১০০ ইউনিট ব্যবহারকারীদের বিদ্যুতের মূল্য আগামী পাঁচ বছরে বাড়াবে না। যেখানে বাংলাদেশের প্রায় ৯০ ভাগ বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী পরিবার ১০০ ইউনিটের ওপরে বিদ্যুৎ ব্যবহার করে। তার মানে তারা সবার বিদ্যুতের দাম বাড়াবে।

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ইশতেহারের পর্যালোচনায় দেখা যায় এর বেশ কিছু দিক পারস্পারিক সাংঘর্ষিক এবং একই সাথে অনেক বিষয়ই বাস্তবায়নযোগ্য নয়। ঐতিহ্যগতভাবে যে কোনো নির্বাচনী ইশতেহার স্বপ্নদর্শী হয়ে থাকে এবং ইশতেহারের প্রতিশ্রুত বিষয়গুলো বাস্তবায়নের একটি দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা থাকে। এই বিষয়গুলো জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ইশতেহারে অনুপস্থিত হবে বলে প্রতীয়মান। তাদের ইশতেহার প্রমাণ করেছে যে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ গুরুত্বপূর্ণ নয় বরং ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য কিছু সস্তা প্রতিশ্রুতি দেয়াটাই গুরুত্বপূর্ণ।

ইশতেহারে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্যর কথা বলা হয়েছে। কিন্তু বলা হয়নি কেমন করে এই ভারসাম্য তারা নিশ্চিত করবেন। বিশ্বের যেখানেই সংসদীয় গণতন্ত্রের চর্চা রয়েছে সেখানেই রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রচলিত ব্যবস্থারই প্রতিফলন দেখা যায়। অপরদিকে বিরোধীদল থেকে ডেপুটি স্পীকার নির্বাচন করলেই কিন্তু ক্ষমতার ভারসাম্য আসে না। তাছাড়া স্বাধীনতার পর গত ৪৭ বছরে বাংলাদেশের সংসদীয় ব্যবস্থা একটি ঐতিহ্য এবং পরিপক্বতার মধ্য দিয়ে আজ এ পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে। বর্তমান ব্যবস্থায় গণতন্ত্রের চর্চায় কোনো প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়নি। এই প্রেক্ষাপটে ঐক্যফ্রন্টের ক্ষমতার ভারসাম্যের যে অঙ্গীকার তা অগ্রহণযোগ্য এবং এক ধরনের চমক সৃষ্টি করার সস্তা প্রচেষ্টা বলে অনুমেয়। ঐক্যফ্রন্ট সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের সংস্কার/বাতিলের কথা বলেছে। অথচ ঐক্যফ্রন্ট নেতা ড. কামাল হোসেন নিজেই ১৯৭২ সালে সংবিধান প্রণয়নের সময় এ অনুচ্ছেদ অন্তর্ভুক্ত করেছেন।

ইশতেহারে ঐক্যফ্রন্ট বলেছে, তারা যুদ্ধাপরাধীদের চলমান বিচারকার্যকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াতের প্রার্থীদের সাথে নিয়ে ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচন করছে। এই প্রার্থীদের অনেকেই যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত। এরকম একটি প্রেক্ষাপটে এই বিচারকার্য চালিয়ে নেয়ার যে প্রতিশ্রুতি ঐক্যফ্রন্ট দিয়েছে তা স্ববিরোধী এবং হাস্যকর। ধারণা করা যায়, দেশের আপামর জনতা যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ব্যাপারে সোচ্চার হওয়ার কারণে কেবলমাত্র ভোট পাওয়ার বিষয়কে মাথায় রেখে ঐক্যফ্রন্ট তাদের ইশতেহারে এ বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করেছে। মুক্তিযোদ্ধা এবং শহীদদের তালিকা প্রণয়ন করার বিষয়ে ঐক্যফ্রন্ট যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে সে বিষয়টিও প্রশ্নবিদ্ধ। কেননা বাংলাদেশে ইতোমধ্যে এই তালিকা অনেক যাচাই বাছাই পূর্বক প্রণয়ন করা হয়েছে। উল্লেখ্য, ইতোপূর্বে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া নিজেই মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের সংখ্যা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করায় বিতর্কিত হয়েছিলেন।

সাংবাদিকদের মন জয় করার জন্য ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিলের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে। অথচ এই ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের প্রক্রিয়ার শুরুটা হয়েছিলো ২০০৬ সালে বিএনপি সরকার ক্ষমতা থাকাকালীন আইসিটি অ্যাক্ট এর খসড়া প্রণয়নের মধ্য দিয়ে। তাছাড়া ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের যে ব্যাখ্যা তা উদ্দেশ্যমূলক ভাবে নেতিবাচক ভাবে প্রচার করা হয়েছে। এই আইন সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতাকে খর্ব করে না। বরং তাদের অধিকার রক্ষা করার জন্য করা হয়েছে। এ ধরনের প্রতিশ্রুতি কেবল মাত্র ক্ষমতায় যাওয়ার একটি হীন পন্থা বলে সহজেই বোধগম্য। দেশের সংবাদ মাধ্যম এবং টিভি চ্যানেলের বিভিন্ন খবর ও টকশো দেখলেই এটা প্রমাণিত হয় যে বাংলাদেশের সাংবাদিকরা তাদের সর্বোচ্চ স্বাধীনতা ভোগ করছেন। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন কোনো ভাবেই এই স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করছে না।

জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট তাদের ইশতেহারে নারীর ক্ষমতায়নের কথা বলেছে। অথচ এবার সংসদ নির্বাচনে তাদের নারী প্রার্থীর নগণ্য সংখ্যা দেখলেই যে কেউ বিশ্বাস করবে তারা আসলে নারীর ক্ষমতায়নের কথা বলেছে। অথচ এবার সংসদ নির্বাচনে তাদের নারী প্রার্থীর নগণ্য সংখ্যা দেখলেই যে কেউ বিশ্বাস করবে তারা আসলে নারী ক্ষমতায়নে কোনো ধরনের উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারবে না। রোহিঙ্গা সমস্যা, তিস্তার পানি বণ্টন, ভারত ও চীনের সাথে সম্পর্ক ইত্যাদি পররাষ্ট্র নীতি বিষয়ক যে অঙ্গীকার জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট করেছে তা ইতোমধ্যে বর্তমান সরকার বাস্তবায়ন করে চলছে এবং এই প্রয়াস অব্যাহত রয়েছে। কাজেই এই অঙ্গীকারের মধ্যে নতুনত্ব কিছু নেই বরং তা এক ধরনের ধার করা চিন্তা-ভাবনা বলে সহজেই অনুমেয়। বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম না বাড়ানোর অঙ্গীকার করা হয়েছে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ইশতেহারে। এ ধরনের ইউটিলিটি সার্ভিসের দাম মূলত: দেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থা এবং আন্তর্জাতিক বাজারের উপর উঠানামা করে। এ ধরনের অঙ্গীকারের পিছনে প্রচুর হোম-ওয়ার্ক প্রয়োজন আছে যা জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট করেছে বলে মনে হয় না।

সার্বিকভাবে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের যে ইশতেহার তা জনগণের আশা আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটাতে ব্যর্থ হয়েছে। এটি সম্পূর্ণভাবে ক্ষমতায় যাওয়া কেন্দ্রিক একটি ইশতেহার হয়েছে। এর মধ্যে মিথ্যা আশ্বাস দেয়া হয়েছে যার বাস্তবায়নের কোনো রোড ম্যাপ দেওয়া হয়নি। এটি সম্পূর্ণ জাতিকে বিভ্রান্ত করার অপচেষ্টা মাত্র।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সেই রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলেন, চলমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ঐক্যফ্রন্টের ইশতেহারটি খুব বেশি গ্রহণযোগ্য হবে না। স্থবির কিছু রাজনৈতিক দলের নেতাদের সমন্বয়ে ইশতেহারটি করা হয়েছে। সুতরাং তাদের ইশতেহারটিও স্থবিরতার চিত্র মাত্র। বিএনপি-জামায়াত নিয়ন্ত্রিত ঐক্যফ্রন্ট যে ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে সেটি তাদের ইশতেহারে প্রকাশিত হয়েছে।