জমি পেলেই ডিএনসিসির বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্প শুরু

বাসাবাড়িতে ব্যবহৃত বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্প গ্রহণ করেছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)। বিদ্যুৎ বিভাগের তত্ত্বাবধানে ডিএনসিসির আমিনবাজার ল্যান্ড-ফিল এলাকায় এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। এরইমধ্যে সরকারি ক্রয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি এই প্রস্তাব অনুমোদন করেছে। প্রকল্প অনুযায়ী, ডিএনসিসি স্পন্সর কোম্পানিকে ৩০ একর জমি ও দিনে ৩ হাজার মেট্রিক টন বর্জ্য সরবরাহ করবে। এজন্য ৬৩০ কোটি টাকা প্রয়োজন হলেও ডিএনসিসি পেয়েছে মাত্র ৩৭ কোটি টাকা। এ ছাড়া প্রকল্পের অন্যান্য কাজ শেষ পর্যায়ে থাকলেও এখন পর্যন্ত জমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া শুরু হয়নি। এ অবস্থায় জমি অধিগ্রহণ হলেই প্রকল্পের কাজ শুরু হবে বলে জানিয়েছে উত্তর সিটি।

প্রকল্প সূত্র জানিয়েছে, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড এবং প্রক্রিয়াকরণ কমিটির সুপারিশের আলোকে বেসরকারি খাত বিদ্যুৎ উৎপাদনের নীতি ১৯৯৪-এর আওতায় চায়না মেশিনারিজ ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশন (সিএমইসি) কর্তৃক ডিএনসিসিতে ৪২ দশমিক ৫ মেগাওয়াট ক্ষমতার বর্জ্য বিদ্যুৎকেন্দ্রে ইনসিনারেশন পদ্ধতিতে বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে। আগামী ২০ মাসের মধ্যে সিএমইসি এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে। চুক্তির মেয়াদ হবে ২৫ বছর।

স্পন্সর কোম্পানি নিজ ঝুঁকিতেই প্লান্ট স্থাপন, পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় বহন করবে। বিদ্যুৎ বিভাগের কাছে উৎপাদিত বিদ্যুৎ বিক্রির মাধ্যমে ব্যয় নির্বাহ করবে তারা। সিটি করপোরেশন প্লান্ট স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় জমির সংস্থান এবং নিয়মিত বর্জ্য সরবরাহ করবে।

প্লান্টটি চালু হলে সেখানে প্রতি সপ্তাহে একুশ হাজার মেট্রিক টন বর্জ্য সরবরাহ করতে হবে। এই পরিমাণ বর্জ্য সরবরাহ করতে না পারলে উত্তর সিটি করপোরেশনকে প্রতি টন ঘাটতি বর্জ্যের জন্য তিন হাজার টাকা হারে স্পন্সর কোম্পানিকে ক্ষতিপূরণ প্রদান করতে হবে। অপরদিকে সরবরাহ থাকা সত্ত্বেও ডিএনসিসি কর্তৃক সরবরাহকৃত বর্জ্য গ্রহণ না করা হলে প্রতি টন ঘাটতি বর্জ্যের জন্য একইভাবে ডিএনসিসিকেও স্পন্সর কোম্পানি ক্ষতিপূরণ দেবে। এ কারণে বর্জ্য সংগ্রহে বাড়তি তাগিদ থাকবে ডিএনসিসির। এ পরিমাণ বর্জ্য নিয়মিত সংগ্রহ করতে হলে দেখা যাবে আর কোথাও ময়লা-আবর্জনা পড়ে থাকবে না।

প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করতে হলে ৩০ একর জমি দিতে হবে স্পন্সর কোম্পানিকে। তবে ৩০ একরের বেশি জমির প্রয়োজন হলে তা স্পন্সর কোম্পানি নিজ উদ্যোগে ক্রয় বা দীর্ঘমেয়াদে লিজ নেবে। প্রকল্পে বর্জ্য পুড়ে তৈরি হওয়া ছাই রাখার জন্য আঙিনা নির্মাণের জন্য অতিরিক্ত ২০ একর জমির প্রয়োজন হবে। প্রকল্পে উৎপাদিত বিদ্যুৎ সরকারই কিনে নেবে।

জানতে চাইলে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র মো. আতিকুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, প্রকল্পটি বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয় থেকে ভেটিং বা পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। সেখান থেকে অর্থ মন্ত্রণালয়ে যাবে। এরপর সরকার থেকে জি টু জি চুক্তি হবে।

তবে প্রকল্পের এখনও জমি অধিগ্রহণ হয়নি বলে জানান মেয়র। তিনি বলেন, আগামী ফেব্রুয়ারি মাসের মধ্যে আমাকে সাত বিঘা জমি দিতে হবে। এই জমি অধিগ্রহণের অর্থ এখনও আমরা পাইনি। এজন্য ৬৩০ কোটি টাকা দরকার। এ থেকে মাত্র ৩৭ কোটি টাকা পেয়েছি। আমাদের প্রকল্পের পুরো কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে। আমি স্থানীয় সরকারমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেছি। তিনি অর্থ সচিবের সঙ্গে কথা বলেছেন। অর্থ সচিব বলেছেন দ্রুত অর্থ ছাড়ের ব্যবস্থা করবেন। কারণ, এটি প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকার প্রকল্প।

তিনি আরও বলেন, এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করে যদি বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হয়; তাহলে বাংলাদেশের চিত্র ঘুরে যাবে। তখন বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য কয়লা বা গ্যাসের প্রয়োজন হবে না। গ্যাস ইন্ডাস্ট্রিতেও সরবরাহ করা যাবে, এতে সংকট থাকবে না।

আতিকুল ইসলাম বলেন, জমি অধিগ্রহণ না হলে আমি চুক্তি সই করবো না। কারণ, চুক্তি স্বাক্ষরের পর তিন মাসের মধ্যে যদি জমি দিতে না পারি তাহলে আমাকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। সেক্ষেত্রে জমি দিতে না পারলে তো তারা প্রকল্প শুরু করতে পারবে না। আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, অধিগ্রহণের পর চুক্তি সই করবো। এখন যত দ্রুত জমি অধিগ্রহণ হবে তত দ্রুত প্রকল্প বাস্তবায়ন হবে।

বর্তমানে আমিনবাজার ল্যান্ড-ফিলে যে জমি রয়েছে তা ব্যবহার করা যাবে না বলেও জানান মেয়র। তিনি বলেন, ওই জমিতে প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। কারণ, সেখানে প্রকল্প শুরু করতে হলে জমিতে ফাইলিং করতে হবে। বর্জ্যের কারণে ল্যান্ড-ফিল অনেক উঁচু হয়ে পড়েছে। সেখানে কোনও ফাইলিং করা যাবে না। তাই নতুন জমি দেখতে হবে।

প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ডিএনসিসি এলাকায় দিনে দুই হাজার সাতশ’ থেকে তিন হাজার মেট্রিক টনের মতো বর্জ্য উৎপাদন হয়। নতুন এলাকাগুলো থেকে বর্জ্য সংগ্রহ শুরু করলে পরিমাণ আরও বাড়বে। এমন বিধান রাখায় ডিএনসিসি বর্জ্য সংগ্রহে আগ্রহী হবে। কোথাও ময়লা পড়ে থাকবে না।

এ প্রক্রিয়ায় বর্জ্য প্রায় সম্পূর্ণ পুড়িয়ে বর্জ্যের আয়তন ৯০ শতাংশ হ্রাস করা সম্ভব বলে মনে করছে সিটি করপোরেশন। এর ফলে পৌর-বর্জ্য রাখার জন্য জমির চাহিদাও হ্রাস পাবে। আবার ইনসিনারেশন প্রযুক্তি প্রয়োগে বর্জ্যের দহনে সৃষ্ট গ্যাসীয় নিঃসরণও কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত হবে।

স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় বলছে, বর্তমানে বিশ্বে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থার ব্যাপক উন্নতি হওয়ায় মানুষের মাথাপিছু আয় বেড়েছে। বেড়েছে ভোগ ও বর্জ্যের পরিমাণও। কিন্তু এসব বর্জ্য নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় নদ-নদী, খাল-বিল, ড্রেনে তৈরি হচ্ছে জলাবদ্ধতা। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পরিবেশ। প্রকল্পটির সফল বাস্তবায়ন হলে দেশের সব সিটি করপোরেশন, পৌরসভা এবং জেলা পর্যায়ে ইনসিনারেশন পদ্ধতিতে বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে সরকার।